দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২২ সাল থেকে একের পর এক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনটি দেশে সরকারের পতন ঘটলেও, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রূপান্তরের ক্ষেত্রে দেশগুলোর অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এসব আন্দোলনে ক্ষমতার পরিবর্তন পর্যন্ত মিল থাকলেও পরবর্তী সংস্কার ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের গল্পগুলো আলাদা হয়ে গেছে। শনিবার দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্স ২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে ‘ট্রানজিশন আফটার আপরাইজিং: দ্য এক্সপেরিয়েন্স অব পোস্ট-আপরাইজিং স্টেট’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড ridicuঅ্যানালিটিকস (দায়রা) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘বাংলাদেশ অ্যান্ড আ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড: আনচার্টেড টাইমস, এমার্জিং অর্ডারস অ্যান্ড দ্য পলিটিকস অবコア’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহানের সভাপতিত্বে এই অধিবেশনে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রূপান্তরের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনায় উঠে আসে কীভাবে রাষ্ট্রগুলো নাগরিকদের দেওয়া উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে, যা সরকার ও জনগণের সামাজিক চুক্তিকে দুর্বল করে অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে।
নেপালের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কাঠমান্ডুভিত্তিক ‘হিমাল সাউথএশিয়ান’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক কনক মণি দীক্ষিত বলেন, ২০২৫ সালে নেপালে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সুশাসনের দাবিতে তরুণদের নেতৃত্বে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা দ্রুতই বৃহত্তর সংকটে রূপ নেয়। শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে এতে অন্য শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটে এবং তা সহিংসতায় রূপ নেয়, যার ফলে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো আক্রান্ত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বিক্ষুব্ধ জনতা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় প্রবেশ করলেও পরে ফিরে এসেছিল, কিন্তু নেপালে ভবনগুলো পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এই পার্থক্যের পেছনে অ্যালগরিদম নাকি গণমাধ্যম-প্রভাবিত জনতার মনস্তত্ত্ব কাজ করেছে, তা স্পষ্ট নয়। তিনি তদন্ত কমিশনের ব্যর্থতা ও প্রতিবেদন প্রকাশে গড়িমসির সমালোচনা করে বলেন, স্বচ্ছতা ছাড়া কোনো সমাজ এগোতে পারে না। দীর্ঘ আট বছরের আলোচনার পর অর্জিত নেপালের বর্তমান সংবিধানকে রক্ষা করাই এখন মূল দায়িত্ব বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া, নেপালে গত তিন মাসে ‘সিগন্যাল অ্যাপের’ ব্যবহার বৃদ্ধিকে গণতন্ত্রের মান নিম্নগামী হওয়ার লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ভূমিকা নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে তিনি বলেন, এই অঞ্চলের ছোট রাষ্ট্রগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় হস্তক্ষেপে প্রভাবিত হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশীয় অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো রজনী গমেজ বলেন, রাষ্ট্রগুলো নাগরিকদের দেওয়া উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার ও নাগরিকের সামাজিক চুক্তি দুর্বল হয়ে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। আন্দোলনের সময় মানুষের প্রত্যাশা মৌলিক পরিবর্তনের দিকে থাকলেও কাঠামোগত সংস্কার সময়সাপেক্ষ হওয়ায় তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু এর ওপর নির্ভর করে উন্নয়ন-প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব নয়; বরং অতিরিক্ত চাপ প্রশাসনে সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাজ্যের সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক পল্লবী রায় বলেন, আন্দোলনের সাফল্য কেবল সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, পরবর্তী রূপান্তর-পরিকল্পনাও অত্যন্ত জরুরি। ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এটি সরকারি নিয়োগ ও পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু হলেও তা শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার মতো একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা করেছে। কেনিয়া, নাইজেরিয়া, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এসব আন্দোলনের ফলে এখন পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির বদলে ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি ও নতুন নেতৃত্বের উত্থানের পথ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) উপদেষ্টা মির্জা হাসান বলেন, এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, তবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কোনো সুস্পষ্ট কর্মসূচি এতে ছিল না। শহরের অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষ ও শিল্পশ্রমিকদের অংশগ্রহণই এই আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিল। তবে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি গণতন্ত্রে উত্তরণ হিসেবে না দেখে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করেন। মির্জা হাসান মন্তব্য করেন, আন্দোলনের সূচনাকারী শক্তিগুলো এখন প্রান্তিক হয়ে পড়েছে এবং পুরোনো ব্যবস্থার অংশীদারেরাই আবার প্রভাবশালী অবস্থানে ফিরে এসেছে। তবে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসাকে তিনি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন।

