সন্তানের অভিভাবকত্ব পেতে মায়ের দীর্ঘ লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা

সন্তানের পূর্ণ অভিভাবকত্ব পাওয়ার লড়াইয়ে টিকে থাকার গল্প শোনালেন চারজন মা। রাজধানীর শুক্রাবাদে দৃকপাঠ ভবনে শিশুদের অভিভাবকত্ব সম্প্রসারণ প্রস্তাব (সিজিইপি) আয়োজিত সংলাপে অংশ নিয়ে তারা তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। নাগরিক কোয়ালিশনের সহায়তায় আয়োজিত এই সংলাপে মায়েরা যখন তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন, তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা, যা উপস্থিত অন্যদেরও আবেগপ্রবণ করে তোলে।

অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন জানান, ২০১৭ সালে মামলা করার পর ২০২৪ সালে তিনি মেয়ের পূর্ণ অভিভাবকত্ব পেয়েছেন। ২০১৪ সালে বিচ্ছেদের পর সাবেক স্বামী অন্য বিয়ে করেন এবং মেয়েকে কানাডা নেওয়ার জন্য বাঁধনের স্বাক্ষর চেয়ে চাপ দেন। আইনজীবী জানান, আইন অনুযায়ী বাবা সন্তানের অভিভাবক হওয়ায় বাঁধন এ বিষয়ে অসহায়। বর্তমানে মেয়ের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার খরচ বেড়ে যাওয়ায় তিনি যখন বাবার কাছে সহায়তা চান, তখন তাকে পুনরায় আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বাঁধন মনে করেন, শুধু আইনি আদেশ নয়, বরং সন্তান পালনের দায়িত্ব বাবা ও মা দুজনকেই সমানভাবে নিতে হবে।

সংগীতশিল্পী ওয়ারদা আশরাফ জানান, বিচ্ছেদের পর তাকে এক কাপড়ে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালে বিচ্ছেদের সময় তার সন্তানদের বয়স ছিল যথাক্রমে ৫ ও আড়াই বছর। তিনি জানান, আদালতের মাধ্যমে ২০২২ সাল থেকে সন্তানরা তার কাছে আসার অনুমতি পেলেও, বাবার কাছে থাকার সময় মায়ের বিরুদ্ধে নেতিবাচক কথা বলায় সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তুলতে হচ্ছে।

শিক্ষিকা আতকিয়া আসিমা জানান, সন্তানের বয়স ছয় মাস থাকতেই শ্বশুরবাড়ি থেকে খরচ বহন করতে বলা হলে তিনি স্বামীকে তালাক দেন। এরপর সন্তানকে বাবার কাছে দেখানোর আদালত অবমাননাকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে তাকে। তার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে নিজে হাতে লেখা একটি বক্তব্য পাঠের মাধ্যমে মায়ের প্রতি সমর্থন জানায়।

অধিকারকর্মী কানিজ ফাতেমা মিথিলা জানান, ২০২৪ সালে তার সাত বছরের আইনি লড়াই শেষ হয়। তবে তিনি প্রশ্ন রাখেন, অভিভাবকত্ব পেলেই কি একজন মায়ের লড়াই শেষ হয়? তিনি আক্ষেপ করেন যে, বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতিতে মায়েরা উন্নত বিশ্বের মতো কোনো সরকারি সহায়তা পান না।

সংলাপের সঞ্চালক ও সিজিইপির আহ্বায়ক আইনজীবী দিলরুবা শরমিন বলেন, ১৮৯০ সালের গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস আইনের অধীনে মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিষ্টানসহ সব সম্প্রদায়ের পারিবারিক আইনে পিতাকেই আইনসংগত অভিভাবক হিসেবে গণ্য করা হয়। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত আইরিন খান নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষায় জাতীয় সংসদে আলাদা ককাস গঠনের প্রস্তাব করেন। এছাড়া মানবাধিকারকর্মী নূর খান এবং একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বিচ্ছেদ ও অভিভাবকত্ব বিষয়ে অভিন্ন পারিবারিক আইন (ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড) প্রণয়নের ওপর জোর দেন। সংসদ সদস্য ফাহিমা নাসরীনও এই দাবির সাথে একমত পোষণ করেন।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন মা আবার বিয়ে করলে অভিভাবকত্ব হারাবেন—এমন বৈষম্যমূলক আইনি বিধান পরিবর্তনের সুপারিশ করেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক গীতিয়ারা নাসরীন, আলোকচিত্রশিল্পী শহিদুল আলম এবং বিভিন্ন অধিকারকর্মী ও সরকারি প্রতিনিধিগণ।

২০১৯ সালে মামলা করেন।.ওয়ারদা আশরাফ জানান, বাবার কাছে থাকলেও ২০২২ সাল থেকে সন্তানেরা তাঁর কাছেও এসে থাকার অনুমতি পেয়েছে।