দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাত বর্তমানে চরম সংকটের মুখে পড়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এই খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, নিকট অতীতে এ খাতে ঋণস্থিতি এভাবে কমে যাওয়ার নজির নেই। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে এই খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধি করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কোয়ার্টারলি রিপোর্ট অন সিএমএসএমই ফাইন্যান্সিং’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণস্থিতি ছিল ৩ লাখ ১৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা ১৬ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা বা ৫.১৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৮০৯ কোটি টাকায়। বছরের প্রথম তিন মাসে এই খাতের সম্প্রসারণ হওয়ার বদলে উল্টো সংকোচন ঘটেছে। এমনকি ২০২৫ সালের মার্চে থাকা ৩ লাখ ২ হাজার ১৭৪ কোটি টাকার ঋণস্থিতির তুলনায়ও বর্তমানের চিত্র পিছিয়ে রয়েছে।
দেশের জিডিপিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এবং কৃষিবহিড়্ভূত মোট কর্মসংস্থানের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই এখান থেকে আসে। বর্তমানে সারা দেশে ১ কোটি ১০ লাখের বেশি সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার ৭০ শতাংশই ঢাকার বাইরে অবস্থিত। ফলে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। জাতীয় এসএমই নীতি অনুযায়ী, চলতি বছরে মোট ঋণের ২৫.৫০ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণের লক্ষ্য থাকলেও মার্চ শেষে তা মাত্র ১৫.৮৭ শতাংশে নেমে এসেছে। নারী উদ্যোক্তা ঋণ এবং ক্লাস্টারভিত্তিক ঋণের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।
এ খাতে খেলাপি ঋণের হার বৃদ্ধি পাওয়া বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মার্চ শেষে সিএমএসএমই খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ২৬.০৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ডিসেম্বরে ছিল ২৪.০৩ শতাংশ। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৪৩.৯৭ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ৪২.৭৩ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে গ্রামীণ অঞ্চলের ১ লাখ ১৫ হাজার ৬০৪টি প্রতিষ্ঠানে ১২ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ হয়েছে, তবে সামগ্রিক ঋণস্থিতি কমায় গ্রামীণ বাজার ও স্থানীয় ব্যবসায় অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে ঋণপ্রবাহ কম। অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে, যার একটি বড় অংশ সিএমএসএমই খাতের জন্য। তবে সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, বড় ঋণগ্রহীতারা নানা সুবিধা পেলেও ছোট উদ্যোক্তারা জটিল শর্তের কারণে ঋণ নিতে আগ্রহী হন না। তিনি সিএমএসএমই খাতের জন্য কম সুদের পুনঃঅর্থায়ন স্কিম জোরদার এবং জামানতবিহীন ঋণের জন্য ক্রেডিট গ্যারান্টি সুবিধা সহজ করার পরামর্শ দেন।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ৫২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা সিএমএসএমই ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি ৭ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে শীর্ষস্থানে রয়েছে। এছাড়া পূবালী, সিটি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি শীর্ষ পাঁচের তালিকায় রয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আইডিএলসি, লংকাবাংলা, আইপিডিসি, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স ও অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে।

