আড়িয়ল বিলের পাঁচ দেশি মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত

দেশের মধ্যাঞ্চলের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীন প্লাবনভূমি আড়িয়ল বিলের পাঁচ ধরনের দেশি মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জ জেলায় অবস্থিত ২৬০ বর্গমাইল বা ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬০০ একর আয়তনের এই বিলের মাছ নিয়মিত ঢাকাসহ আশপাশের বাজারে বিক্রি হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের গবেষকেরা কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি মাছের অন্ত্র ও মাংসপেশিতে এসব কণা খুঁজে পেয়েছেন। গত জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস অ্যাডভান্সেস’-এ এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে কই মাছে। গবেষকদের মতে, কই মাছ সর্বভুক স্বভাবের হওয়ায় তলানি ও প্লাঙ্কটনের সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিক কণা সহজেই গ্রহণ করে। বর্ষা, শীত ও শুষ্ক—এই তিন মৌসুমেই প্রতিটি কই মাছের মাংসে গড়ে একটি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অন্য চার প্রজাতির ক্ষেত্রে মাংসপেশিতে এই সংখ্যা ছিল গড়ে শূন্য দশমিক ৫০ থেকে শূন্য দশমিক ৯০টির মধ্যে। এছাড়া কই মাছের অন্ত্রে গড়ে ১ দশমিক ৭০ থেকে ১ দশমিক ৯০টি এবং ফুলকায় ১ দশমিক ৩০ থেকে ১ দশমিক ৪০টি কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণা দলটি ২০২৪ সালের বর্ষা, ২০২৪-২৫ সালের শীত এবং ২০২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে বিলের পাঁচটি স্থান থেকে পানি ও তলানির নমুনা সংগ্রহ করে। একই সময়ে ১৫০টি মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়। বিশ্লেষণে বিলের প্রতি লিটার পানিতে ১১ থেকে প্রায় ৩২টি এবং প্রতি কেজি তলানিতে ১২ থেকে ১২৭টির বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। দূষণের উৎস হিসেবে কাপড় ধোয়ার সময় নির্গত কৃত্রিম তন্তু, গৃহস্থালির বর্জ্যপানি এবং মাছ ধরার জালকে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাসায়নিক বিশ্লেষণে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপাইলিন ও পলিস্টাইরিন জাতীয় প্লাস্টিকের আধিক্য দেখা গেছে।

ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহান জানান, যদিও এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির আশঙ্কা কম, তবে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, শরীরে জমতে থাকা এসব উপাদান হয়তো ৫-১০ বছরে বোঝা যাবে না, কিন্তু ২৫-৩০ বছর পর এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এর প্রভাব যেতে পারে। মাছের অন্ত্র বা ফুলকায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার ঘটনা আগে জানা থাকলেও, মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত মাংসপেশিতে এর উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।

এর আগে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ঢাকার বিভিন্ন হ্রদ, সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের মাছ ও চিংড়িতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। তবে আড়িয়ল বিলের এই পাঁচ প্রজাতির মাছ নিয়ে এটিই প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গাউসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরী দূষণ কমাতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন, গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে না রাখা এবং কাচ, স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।