বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট: দায় কার, উত্তরণের পথ কী

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ছয় মাসে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত জনজীবন ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর তীব্র বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় জরুরি আইন করে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এই সংকট কেবল দৈনন্দিন জীবনেই নয়, বরং শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর বিকেলেও সারাদেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা চলতি বছরের ১০ আগস্টের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটের কাছাকাছি।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা এই সংকটের পেছনে এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং পূর্ববর্তী সরকারের আমদানি-নির্ভর জ্বালানি নীতিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। ২০১০ সালেই তৎকালীন সরকারকে বিদ্যুৎ খাতের সংকট সমাধানে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, সরকার এই সংকট মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তিনি জানান, এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি সারানো হয়েছে, তবে কার্গো আমদানিতে সমস্যা রয়ে গেছে। শিল্পের গ্যাস সংকট কমাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ভোলা থেকে গ্যাস আনার পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা সরকারের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, ছয় মাস সময় কোনো বড় সমস্যা সমাধানের জন্য পর্যাপ্ত না হলেও সরকারের ব্যবস্থাপনায় স্পষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। তিনি বলেন, সংকটের কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধানের কোনো দৃশ্যমান পরিকল্পনা সরকারের নেই। বরং কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় সরকারের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি. ডি. রহমতউল্লাহ বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কার্যক্রমের অভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট থেকে মুক্তির কোনো কার্যকর কর্মসূচি এখনো স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ৩৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে বর্তমান সংকট অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে আসত। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতায় না চলায় সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের পক্ষ থেকে আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হলেও তার বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সরকারের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।