দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন: পুতিন-সির উপস্থিতিতেও আলোচনায় ট্রাম্পের নীতি

যুক্তরাষ্ট্র ব্রিকসের সদস্য না হলেও ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আজ শনিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া দুই দিনব্যাপী ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও সিদ্ধান্তের প্রভাব বড় একটি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। সম্মেলনের আয়োজক দেশ ভারত ছাড়াও এতে অংশ নিচ্ছেন চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও ইরানসহ জোটের ১১টি দেশের শীর্ষ নেতারা। এ ছাড়া বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছে সৌদি আরব। বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নেতাদের আলোচনায় বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের অব্যাহত হুমকি এবং ইরান যুদ্ধ ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

তবে এই শীর্ষ সম্মেলন থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে কোনো যৌথ বিবৃতি আসার সম্ভাবনা বেশ কম। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি বা ভূরাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় কোনো সমন্বিত কৌশল নেওয়াও ব্রিকসের জন্য কঠিন হবে। এর প্রধান কারণ হলো, ওয়াশিংটনকে কতটা চ্যালেঞ্জ করা হবে, তা নিয়ে জোটের সদস্যদের মধ্যেই রয়েছে গভীর মতপার্থক্য। আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান এ প্রসঙ্গে বিবিসিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিপরীতে যায়—এমন কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়ার সক্ষমতা ভারতের নেই। নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির পর সম্প্রসারিত ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ স্বার্থের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক তৈরি হয়েছে। ফলে মার্কিন নীতির কোনো সমালোচনা করা হলেও তা হবে অত্যন্ত অস্পষ্ট ও পরোক্ষ।

যদিও রাশিয়া ও ইরান চাইবে এই জোট যেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও স্পষ্ট অবস্থান নেয়, কিন্তু ব্রিকসের ভেতরের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। যেমন ভারত বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ সময়ে ওয়াশিংটন অসন্তুষ্ট হতে পারে, এমন কোনো পদক্ষেপ দিল্লি নেবে না। অন্যদিকে চীনও অত্যন্ত সতর্ক থাকবে যেন ব্রিকসকে ব্যবহার করে সরাসরি ওয়াশিংটনকে লক্ষ্যবস্তু করার কোনো ইঙ্গিত প্রকাশ না পায়। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাতের সময় ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়েছিল দেশটি। তাই তেহরানের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে, এমন কোনো বিবৃতিতে আমিরাতের সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কুগেলম্যানের মতে, ব্রিকসের সম্প্রসারণ যেমন এর গুরুত্ব বাড়িয়েছে, তেমনি সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছানোকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ এমন কিছু দেশ এখানে যুক্ত হয়েছে যাদের নিজেদের মধ্যে বনিবনা নেই।

ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও ব্রিকসের কার্যক্রম, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর বা ‘ডি-ডলারাইজেশন’ উদ্যোগের ঘোর বিরোধী। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ব্রিকস দেশগুলো যদি শক্তিশালী মার্কিন ডলারের বিকল্প কোনো মুদ্রাকে সমর্থন দেয়, তবে তাদের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানো হবে। তা সত্ত্বেও গত এক দশকে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ব্রিকসের প্রভাব ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিবিসি মনিটরিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্রিকস দেশগুলো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ, বৈশ্বিক জিডিপির ৪০ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ২৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। জোটটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমাবিরোধী তকমা এড়াতে চাইলেও নিজেদের অর্জনগুলোকে এগিয়ে নিয়ে জি-২০ বা জি-৭-এর মতো শক্তিশালী বিকল্প প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়।

ব্রিকসের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি হলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) প্রতিষ্ঠা করা, যা ইতিমধ্যে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর অবকাঠামো ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পে কয়েক বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করেছে। এ ছাড়া আর্থিক সংকট মোকাবিলায় জোটটির ১০ হাজার কোটি ডলারের একটি জরুরি রিজার্ভ তহবিলও রয়েছে, যদিও তা এখনো ব্যবহারের প্রয়োজন হয়নি। এবারের সম্মেলনে নেতারা স্থানীয় মুদ্রার মাধ্যমে আন্তসীমান্ত লেনদেন ব্যবস্থা সহজ করার বিষয়ে আলোচনা করবেন। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা মস্কো ও তেহরানের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি জাতিসংঘ, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে সংস্কারের দাবিও তুলবে ব্রিকস, যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।

ভারতের জন্য এই সম্মেলন বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) নেতৃত্ব দেওয়ার দাবিকে জোরালো করার বড় সুযোগ। বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা তৈরি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং মুক্ত বাণিজ্যের মতো ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারগুলো ব্রিকসের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এই জোটের ভেতর চীনের বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এবং উন্নয়নশীল বিশ্বে বেইজিংয়ের শক্তিশালী অবস্থান দিল্লির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কুগেলম্যান উল্লেখ করেছেন, মোদি সরকার গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর হতে চাইলেও আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় ভারতের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা সীমিত সাফল্যের মুখ দেখেছে, যেখানে চীন অনেক বেশি সফল। এ ছাড়া সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি ও ইরান সংঘাতের মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের সক্রিয় ভূমিকার কারণে দিল্লি কিছুটা আড়ালে পড়ে গিয়েছিল। তাই বিশ্বে ভারতের নেতৃত্ব ও গুরুত্ব নতুন করে প্রমাণের জন্য এই সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সম্মেলন উপলক্ষে ভারতের রাজধানী দিল্লিকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে এবং হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতিমধ্যে দিল্লিতে এসে পৌঁছেছেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। শুক্রবারের সেই বৈঠকে দুই নেতার মধ্যে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষাসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। শনিবার চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গেও মোদির একটি বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। দুই দেশই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। এ ছাড়া রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ভারতের বাড়তে থাকা বাণিজ্যঘাটতি নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

দিল্লির জন্য এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একটি সর্বসম্মত যৌথ বিবৃতি বা ঘোষণা আদায় করা। গত মে মাসে ইরানে চলমান যুদ্ধ নিয়ে তীব্র মতপার্থক্যের কারণে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কোনো যৌথ বিবৃতি দিতে পারেননি, যার ফলে ভারতকে সভাপতি হিসেবে একটি সারসংক্ষেপ প্রকাশ করতে হয়েছিল। তবে ২০২৩ সালে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন সফলভাবে আয়োজনের অভিজ্ঞতা ভারতের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে, যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তীব্র বিভাজনের মধ্যেও দিল্লি একটি যৌথ ঘোষণা অর্জনে সফল হয়েছিল। ব্রিকসকে কেবল একটি অর্থহীন আলোচনার ফোরাম হিসেবে দেখতে চায় না কোনো সদস্যই, তাই আর্থিক সহযোগিতা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু ঘোষণার মধ্য দিয়ে সম্মেলনটি সফলভাবে শেষ করাই হবে সবার মূল লক্ষ্য।