ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের কূটনৈতিক জয়: ঐতিহাসিক ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’

চরম অস্থিরতা ও বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পর্দা উঠেছিল ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মতো জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আয়োজিত এই সম্মেলনে দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে ১৪০ অনুচ্ছেদের ঐতিহাসিক ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ অনুমোদিত হয়েছে। এটিকে বিশ্বরাজনীতিতে ভারতের একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সম্মেলনটিতে সাত বছর পর ভারতের মাটিতে পা রাখেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এছাড়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, দক্ষিণ আফ্রিকার সিরিল রামাফোসা এবং ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের বিপরীতমুখী অবস্থান সত্ত্বেও ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে একই ঘোষণায় রাজি করানো ছিল ভারতীয় কূটনৈতিক দলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা তারা সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করেছে।

সম্মেলনের খাস কামরায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিশ্বব্যবস্থার বৈষম্য নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দেন। তিনি বলেন, পুরোনো ও অকার্যকর কাঠামো দিয়ে বর্তমান বিশ্ব চলতে পারে না। জোটটি জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের আমূল সংস্কারের দাবি জানিয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তা পরিষদসহ জাতিসংঘের শীর্ষ পরিষদে ভারত ও ব্রাজিলের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়ে চীন ও রাশিয়া নিজেদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেক ও জিডিপির ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী ১১ সদস্যের এই জোট আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। সীমান্ত অতিক্রমী সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসী অর্থায়ন ও নিরাপদ আস্তানা নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহতের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বের একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ব্রিকস। ডলারের আধিপত্য কমাতে সদস্য দেশগুলো নিজেদের স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এ জন্য একটি পেমেন্ট টাস্কফোর্স গঠনের ওপর জোর দিয়েছে। এছাড়া কার্বন বর্ডার ট্যাক্সের মতো বাধানিষেধের বিরোধিতা করা হয়েছে।

গাজায় ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ বন্ধ, ত্রাণ পৌঁছানো এবং ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের নাম উল্লেখ না করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা বজায় রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া লেবানন, সুদান ও সিরিয়া সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের ডাক দেওয়া হয়েছে। সম্মেলনের সমাপনীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং সংক্রামক ব্যাধি রোধে সমন্বিত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।