হিমালয়ের হিমবাহ গলন নিয়ে ৫ মাস আগেই ছিল সতর্কবার্তা

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ৫৪৭ জনের মৃত্যু এবং হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ হওয়ার মাত্র পাঁচ মাস আগেই হিন্দুকুশ-হিমালয় (এইচকেএইচ) অঞ্চলের হিমবাহ গলনের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন গবেষকরা। কিন্তু সেই সতর্কবার্তায় সে সময় কেউ কর্ণপাত করেনি। এমনকি নেপাল সরকার এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জন্য কী ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তাও পরিষ্কার নয়।

কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তঃসরকারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) গত মার্চ মাসে দুটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্রুত গলছে এবং শতাব্দীর শুরু থেকে এই হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকে হিমবাহগুলোর বরফের পুরুত্ব সর্বোচ্চ ২৭ মিটার পর্যন্ত কমে গেছে। এই অঞ্চলটি এশিয়ার ‘পানির টাওয়ার’ হিসেবে পরিচিত এবং ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশসহ প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানি, খাদ্য ও জীবিকার প্রধান উৎস।

আইসিআইএমওডি’র ‘এইচকেএইচ গ্লেসিয়ার আউটলুক ২০২৬’ প্রতিবেদনে ৩৮টি হিমবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিমবাহের মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ এবং বরফের মজুত ৯ শতাংশ কমেছে। গবেষকদের মতে, এটি এমন একটি ইঙ্গিত যে হিমালয়ের কিছু অংশ অপরিবর্তনীয়ভাবে পিছিয়ে যাওয়ার ‘টিপিং পয়েন্ট’-এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। যদিও গবেষণায় স্বীকার করা হয়েছে যে, পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণের অভাব রয়েছে, কারণ ৩৮টির মধ্যে মাত্র সাতটি হিমবাহ বিশ্ব হিমবাহ পর্যবেক্ষণ সংস্থার (ডব্লিউজিএমএস) আন্তর্জাতিক মান পূরণ করে। কারাকোরাম, সিকিম, জান্সকার ও ভুটানের মতো বিশাল হিমবাহসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো এখনও পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণের আওতায় আসেনি।

নেপালের বর্তমান বন্যার কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা একাধিক বিষয়কে দায়ী করছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ৪ হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতায় তুষারপাতের পরিবর্তে বৃষ্টিপাত হওয়া। ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির বিজ্ঞানীদের মতে, উচ্চ তাপমাত্রার কারণে এমনটা ঘটছে। আইসিআইএমওডি’র গবেষকরা লেন্দে খোলা নামক জলধারায় বরফশিলা ধসের সম্ভাবনাও তদন্ত করছেন। গবেষকদের ধারণা, উচ্চ পার্বত্য এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও শিলাখণ্ড ধসে লেন্দে খোলা জলধারায় পড়ায় এই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।

জ্যেষ্ঠ ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজমের মতে, তুষারের আচ্ছাদন কমে যাওয়া এবং স্থায়ীভাবে জমে থাকা মাটির বরফ গলে যাওয়া পাহাড়ের ঢালকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে ৬৩ হাজার ৭০০-এর বেশি হিমবাহ রয়েছে, যা প্রায় ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহগুলোর অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতাভিত্তিক উষ্ণায়নের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় হিমবাহের বড় ক্ষতি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের কাছে নেপালের এই বিপর্যয় কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির একটি বড় সতর্ক সংকেত।

নেপালে যে আকস্মিক বন্যায় ৫৩৮ জনের নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও বিজ্ঞানী ও গবেষকরা তদন্ত করছেন। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে এক্ষেত্রে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ৪ হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতায় যেখানে আগে তুষারপাত হওয়ার কথা, সেখানে বৃষ্টি হচ্ছে। ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারের ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির এক বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, উচ্চ তাপমাত্রার কারণে এমনটা হতে পারে। যে উচ্চতায় একসময় তুষারপাত হতো, সেখানে বৃষ্টিপাত এবং দ্রুত হিমবাহ সরে যাওয়ার পেছনে উষ্ণায়নের ভূমিকা থাকতে পারে।