আইএমএফের কঠোর শর্ত থেকে সরে আসছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেওয়া মৌলিক শর্তাবলি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে বর্তমান সরকার। বিশেষ করে ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, মূল্যস্ফীতি সন্তোষজনক পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করা এবং মুদ্রানীতি ও সুদের হার শিথিল না করার মতো শর্তগুলো সরকার মানছে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের দাম সমন্বয় এবং বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানোর শর্তগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও ঘাটতি রয়েছে।

সরকার মূলত জনবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়ার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, কারণ আইএমএফের শর্তগুলো পুরোপুরি মানতে গেলে সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থের পরিপন্থি কোনো শর্ত মেনে সরকার আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তি করবে না।

বর্তমানে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো কার্যকর ঋণচুক্তি নেই। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের করা আগের চুক্তিটি নতুন সরকার বাতিল করেছে এবং নতুন ঋণ সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই আইএমএফের একটি মিশন ঢাকা সফর করে অর্থনীতির সার্বিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বার্ষিক সভার সাইডলাইনে নতুন ঋণের শর্তাবলি নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

আইএমএফের নিয়ম অনুযায়ী, ঋণের কিস্তি বকেয়া থাকা পর্যন্ত আগের শর্ত মানা বাধ্যতামূলক। তবে নতুন করে ঋণ পেতে হলে বর্তমান সরকারের সঙ্গে নতুন চুক্তি জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে মাঝেমধ্যেই হস্তক্ষেপ করছে, যা আইএমএফের শর্তের পরিপন্থি। আগস্টের শুরুতে ডলারের দাম ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা ছাড়িয়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মৌখিক তদারকিতে তা এখন ১২২ টাকা ৭৭ পয়সায় নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি, ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমবে, এছাড়া কারসাজি রোধেও তদারকি প্রয়োজন।

মুদ্রানীতির ক্ষেত্রেও সরকার নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। আগস্টের শুরুতে নীতি সুদের হার কমানো হয়েছে এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া রিজার্ভের হিসাবের ক্ষেত্রেও নিট রিজার্ভের পরিবর্তে গ্রস রিজার্ভ এবং বিনিয়োগ বাদ দেওয়া রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ করা হচ্ছে। বর্তমানে গ্রস রিজার্ভ ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার এবং বিনিয়োগ করা অর্থ বাদ দিয়ে রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়টিও এখনো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, বরং আগের সরকারের আমলে লুটপাটের কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়ছে।