১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণের প্রকল্পটি ১০ বছর মেয়াদী হলেও ৯ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এখনো ৩টি বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি। এরই মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়েছে। মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৪৪৩ কোটি ৮৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।
ঢাকার নামি স্কুলগুলোতে চাপ কমানো এবং শহরের নিকটবর্তী শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে তৎকালীন সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছিল। ‘ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন’ শীর্ষক এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ১০টি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের ৩০শে জুনের মধ্যে এটি শেষ করার লক্ষ্য ছিল। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ১০তলা একাডেমিক ভবন, জিমনেশিয়াম, শহীদ মিনার, অভ্যন্তরীণ রাস্তা ও সীমানাপ্রাচীরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো এবং কম্পিউটার, ল্যাবরেটরি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক সরঞ্জাম সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- বিলামালিয়া (হেমায়েতপুর), বাঁশবাড়ী-পাথালিয়া (নবীনগর), লাকুরিয়াপাড়া (ধামরাই), পশ্চিমদি (কেরানীগঞ্জ), পূর্ব-নরসিংহপুর (আশুলিয়া), খোর্দ্দঘোষপাড়া (নারায়ণগঞ্জ), জালকুড়ি (নারায়ণগঞ্জ), পূর্বাচল (রূপগঞ্জ), সাঁতারকুল (বাড্ডা) এবং খিলক্ষেত সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়লেও ১০টি প্রতিষ্ঠানের তিনটির নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ১০টি একাডেমিক ভবনের কোনোটির নির্মাণকাজই শতভাগ শেষ হয়নি। এর মধ্যে চারটি ভবনের নির্মাণ অগ্রগতি ৮৮ থেকে ৯৩ শতাংশের মধ্যে, দু’টি ভবনের অগ্রগতি ৩৩ ও ৩০ শতাংশ এবং আরেকটির মাত্র ১০ শতাংশ। অন্যদিকে তিনটি ভবনের নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি। এর মধ্যে একটি বিদ্যালয়ের জমি হস্তান্তর হলেও নির্মাণকাজের চুক্তির জন্য দরপত্র মূল্যায়ন চলছে। অপর দু’টি বিদ্যালয়ের জমি হস্তান্তরের কাজই এখনো শেষ হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্বাচল সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের কবরস্থান নিয়ে জটিলতা রয়েছে। গত বছরের ৯ই অক্টোবর দরপত্র উন্মুক্ত করা হয় এবং মূল্যায়ন চলমান। পূর্ব-নরসিংহপুর সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সীমানা নিয়ে জটিলতা রয়েছে, গত ১২ই জানুয়ারি দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়। খিলক্ষেত সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সয়েল টেস্ট করা হয়েছে এবং গত ১২ই জানুয়ারি দরপত্র চালু হওয়ার পর মূল্যায়ন চলছে।
প্রকল্পের শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৭৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে হয় ৭৫০ কোটি ৪০ লাখ ১০ হাজার টাকা। সর্বশেষ দ্বিতীয় সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০৩ কোটি ৭৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৩০ কোটি ২৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকা বা ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত অর্থ ছাড় হয়েছে ৫২৮ কোটি ৩১ লাখ ৩১ হাজার টাকা।
প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। প্রথম সংশোধনীতে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় সংশোধনীতে তা ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল মেয়াদের তুলনায় প্রকল্পের সময় বেড়েছে ৮৪ মাস বা ২৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার পেছনে সম্ভাব্যতা যাচাই না করাকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের আগে কোনো ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি। এ ছাড়া একনেকে অনুমোদন, প্রশাসনিক আদেশ ও কর্মকর্তা নিয়োগে বিলম্বের কারণে কার্যক্রম শুরু হতে ১১ মাস দেরি হয়। পরে কোভিড-১৯ মহামারি, ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত মামলা, নকশা পরিবর্তন ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি বিলম্ব ঘটিয়েছে।
বিদ্যালয়গুলো চালু করা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২১০টি পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। ৩টি বিদ্যালয়ের জন্য অধ্যক্ষসহ বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের জনবল নিয়োগের প্রস্তাব ২০২৫ সালের আগস্টে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও চূড়ান্ত হয়নি। বর্তমানে অধ্যাপক ড. মীর জাহিদা নাজনীন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, প্রথমবার যথাযথ ভিজিবিলিটি টেস্ট না হওয়া, ২০১৪ সালের রেট শিডিউল অনুযায়ী ডিপিপি তৈরি এবং ২০২২ সালের রেট শিডিউল ও বিল্ডিং কোড পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া আশুলিয়ায় তিনবার স্থান পরিবর্তন, খিলক্ষেতে জটিলতা এবং পূর্বাচলে কবরস্থান নিয়ে মামলার কারণে কাজ শুরু করা যায়নি।

