দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে রোপা আমন মৌসুমের শুরুতেই সার না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও গুদাম লুটের মতো ঘটনা ঘটেছে। সোমবার কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও রাজশাহীতে সারের দাবিতে কৃষকদের এই তীব্র আন্দোলনের খবর পাওয়া গেছে। এর আগে গত ২৩শে আগস্টও কুড়িগ্রামে সারের গুদাম লুটের ঘটনা ঘটেছিল। সারের এই সংকটের মধ্যে চট্টগ্রামে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির দায়ে এক ডিলারকে জরিমানা করেছে প্রশাসন।
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে সারের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে ডিলারের দেখা না পেয়ে উত্তেজিত কৃষকরা একটি গুদাম থেকে শতাধিক বস্তা সার নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সোমবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার রৌমারী মহিলা কলেজপাড়া এলাকায় মেসার্স মিতা-হাসান এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ডিলার পয়েন্টে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, রৌমারী বন্দবেড় ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডসহ আশেপাশের এলাকার মানুষ সার পেতে গভীর রাত থেকেই ওই ডিলার পয়েন্টে জড়ো হতে থাকেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ডিলারের দেখা না পাওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সকাল ১১টা পর্যন্ত সার বিতরণ শুরু না হওয়ায় উত্তেজিত জনতা ডিলারের গোডাউনের টিনের বেড়া ভেঙে ভেতরে ঢুকে ইউরিয়া সারের বস্তা নিয়ে যায়।
ডিলার মো. মতিয়ার রহমান জানান, সকাল সাড়ে ৯টায় সার বিতরণ শুরু করার কথা থাকলেও শত শত কৃষকের ভিড়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে যান। এই সুযোগে গুদামে থাকা কৃষকরা প্রায় শতাধিক বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম জানান, গুদামে ৭৫০ বস্তা সার থাকলেও ক্রেতা ছিলেন প্রায় এক হাজার। পরে পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় বাকি সার বিতরণ করা হয়। রৌমারী ইউএনও মো. মাহবুবুল হাসান জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। তবে রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলম বসুনিয়া দাবি করেছেন, উপজেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পরদিন থেকে খোলা বাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা করা হবে।
কুড়িগ্রামেরই ভূরুঙ্গামারীতে চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে সড়ক অবরোধ ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বারকে অবরুদ্ধ করেন কৃষকরা। সোমবার বেলা ১১টার দিকে সোনাহাট ইউনিয়নের পাটেশ্বরী ব্রিজ পাড় এলাকায় বিএডিসি ডিলার আমজাদ হোসেনের মেসার্স আফি সার ঘরে এ ঘটনা ঘটে। সার না পাওয়ার আশঙ্কায় কৃষকরা বিক্ষোভ শুরু করলে ইউএনও অমৃত দেব নাথ, সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল হক তারেক, থানার ওসি আজিম উদ্দিন ও স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থলে গিয়ে খোলা বাজারে সার বিক্রির আশ্বাস দেন। এরপর পরিস্থিতি শান্ত হলে কৃষকদের মাঝে ৩৩৫ বস্তা ডিএপি, ৯৫ বস্তা টিএসপি ও ১৫৭ বস্তা এমওপি সার বিতরণ করা হয়।
লালমনিরহাটে সারের তীব্র সংকটে আমন ক্ষেত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় সোমবার দুপুরে রংপুর-লালমনিরহাট-কুড়িগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। এতে তিন জেলার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা বাফার সরকারি গুদাম থেকে সার তুলে ইউনিয়ন পর্যায়ে না নিয়ে শহরের নিজস্ব গোডাউনে মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। সোমবার ভোর থেকে সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ও বড়বাড়ি ইউনিয়নের ডিলারের দোকানে ভিড় করেও সার না পেয়ে তারা মহাসড়ক অবরোধে বাধ্য হন। পরে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সাইখুল আরিফিন জানান, সার পর্যাপ্ত রয়েছে, তবে একই পরিবারের একাধিক সদস্য বারবার সার নেওয়ায় দ্রুত শেষ হচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, সার মজুত রাখলে ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। জেলা পরিষদ প্রশাসক এ,কে,এম মমিনুল হকও দাবি করেন, কোনো সংকট নেই এবং বিশৃঙ্খলাকারীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।
রাজশাহীর পুঠিয়াতেও পর্যাপ্ত সার সরবরাহ ও কৃত্রিম সিন্ডিকেট ভাঙার দাবিতে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন প্রায় পাঁচ শতাধিক কৃষক। সোমবার সকালে বানেশ্বর বাজার এলাকায় এই বিক্ষোভ শুরু হলে মহাসড়কের উভয় পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। প্রায় ৪০ মিনিট পর উপজেলা প্রশাসনের আশ্বাসে কৃষকরা অবরোধ তুলে নেন। পুঠিয়া ইউএনও জানান, বানেশ্বরের ডিলারদের বরাদ্দ দেওয়া হয় স্থানীয় ইউনিয়নের কৃষকদের চাহিদার ভিত্তিতে, তবে পার্শ্ববর্তী চারঘাট উপজেলার কৃষকরাও এখান থেকে সার সংগ্রহ করায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগে চট্টগ্রামের পটিয়ায় এক বিসিআইসি ডিলারকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে উপজেলা প্রশাসন। রবিবার বিকেলে উপজেলার কেলিশহর ইউনিয়নের ভট্টাচার্যহাট সংলগ্ন অইল্লারটেক এলাকায় মেসার্স হাজী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম নামের দোকানে অভিযান চালিয়ে এই জরিমানা আদায় করা হয়। জেলা এনএসআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে পটিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল মামুন এই অভিযান পরিচালনা করেন এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯-এর ৪০ ধারায় ডিলার হাজী মো. রফিকুল ইসলামকে এই জরিমানা করেন।
সোমবার সকালে বানেশ্বর বাজার এলাকায় এ বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে প্রায় ৫০০শ’-এর বেশি কৃষক মহাসড়কে অবস্থান নিলে উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। প্রায় ৪০ মিনিট পর উপজেলা প্রশাসনের আশ্বাসে তারা অবরোধ তুলে নেন।বানেশ্বরের সার সরবরাহের ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষকদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগের কথা জানিয়ে ইউএনও বলেন, বানেশ্বরের পাশের চারঘাট উপজেলার অনেক কৃষকও এখানকার ডিলারদের কাছ থেকে সার সংগ্রহ করেন। কিন্তু বানেশ্বরের ডিলারদের বরাদ্দ দেয়া হয় বানেশ্বর ইউনিয়নের কৃষকদের চাহিদার ভিত্তিতে। ইউএনও জানান, প্রায় ৪০ মিনিট মহাসড়ক অবরোধের পর কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়।

