স্মার্টফোনের পকেটে লুকিয়ে রাখা ছোট্ট ডিভাইসই এখন তরুণদের নতুন আসক্তির উৎস হয়ে উঠছে। ই-সিগারেট, ভেপ, হিটেড টোব্যাকো ও নিকোটিন পাউচ—দেখতে কখনো কলম, কখনো ইউএসবি ড্রাইভ, আবার কখনো খেলনার মতো। মিষ্টি ফ্লেভার, তুলনামূলক কম গন্ধ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণীয় প্রচারণায় সহজেই কিশোর-কিশোরীদের দৃষ্টি কাড়ছে এসব পণ্য। প্রথাগত সিগারেটের তুলনায় এগুলোকে ‘আধুনিক’ ও ‘কম ক্ষতিকর’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যার পেছনে রয়েছে তামাক কোম্পানিগুলোর পরিকল্পিত বিপণন কৌশল। ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্ম নিকোটিনের এক নতুন ফাঁদে আটকা পড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে অন্তত দেড় কোটি কিশোর-কিশোরী নিয়মিত ই-সিগারেট ব্যবহার করছে, যাদের একটি বড় অংশের বয়স ১৩ থেকে ১৫ বছর। বাংলাদেশেও ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৭৮ লাখ। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, তামাকজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা তামাক খাত থেকে পাওয়া রাজস্বের প্রায় দ্বিগুণ। গবেষকদের মতে, ই-সিগারেট ব্যবহারকারী শিশু-কিশোরদের পরবর্তীতে প্রথাগত ধূমপানে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তিন গুণ বেশি।
তামাক কোম্পানিগুলো এখন আর কেবল প্রথাগত সিগারেটের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ববাজারে ১৬ হাজারেরও বেশি সুগন্ধিযুক্ত তামাক ও নিকোটিন পণ্য রয়েছে, যার মধ্যে বাবলগাম, চকোলেট, চেরি ও মিন্টের মতো ফ্লেভারগুলো শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করার প্রধান হাতিয়ার। টিকটক, ইউটিউব, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে এসব পণ্যকে ফ্যাশন বা আধুনিক জীবনযাপনের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-সিগারেট বা ভেপিংকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সিডিসি এবং আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির গবেষণায় উঠে এসেছে যে, এসব পণ্য ফুসফুসের জটিলতা, হৃদরোগ, রক্তনালির ক্ষতি, দাঁত ও মাড়ির সমস্যা এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বিকাশে নিকোটিন বাধা সৃষ্টি করে এবং শেখার সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তরুণদের মতে, দেখতে কলমের মতো হওয়ায় এগুলো সহজে লুকিয়ে রাখা যায় এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে অর্ডার দিলেই পাওয়া যায়, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
তামাক নিয়ন্ত্রণে আইনি অগ্রগতি হলেও ই-সিগারেট নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। চলতি বছর পাস হওয়া ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে বিক্রি বন্ধের বিধান থাকলেও ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিষয়টি বাদ পড়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানান, তারা নজরদারি বাড়াচ্ছেন এবং কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ও প্রজ্ঞার এবিএম জুবায়েরসহ বিশেষজ্ঞরা তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাব মোকাবিলায় কঠোর আইন প্রয়োগ, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা বন্ধ এবং সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম বাড়িয়ে তরুণদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

