ইস্তাম্বুলের চুকুরজুমায় একটি ছোট বাড়ি আছে, যা কোনো সাম্রাজ্যের মানচিত্রে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা প্রায় হাস্যকর। অথচ মানুষের স্মৃতির মানচিত্রে বাড়িটির আয়তন অটোমান সাম্রাজ্যের চেয়েও বড় হতে পারে। কারণ সাম্রাজ্য ভেঙে যায়, রাজারা মরে যান, পতাকা বদলে যায়; কিন্তু একটি পুরোনো লবণের পাত্র, একটি সিনেমার টিকিট কিংবা কারও ঠোঁট ছোঁয়া সিগারেটের অবশিষ্টাংশ—এগুলো কখনো কখনো আমাদের কাছে এমন এক অতীতের দরজা খুলে দেয়, যার কোনো নথিবদ্ধ ইতিহাস নেই। সেই বাড়িটির নাম মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স। এখানে ইতিহাস নেই—অন্তত সেই অর্থে নেই, যেভাবে ইতিহাসের বইয়ে ইতিহাস লিখে রাখা হয়। এখানে নেই যুদ্ধের মানচিত্র, রাজাদের প্রতিকৃতি, বিজয়ীর তলোয়ার কিংবা পরাজিতের রক্তমাখা পতাকা। এখানে আছে প্রেমে পড়া মানুষের ফেলে যাওয়া জিনিস। আর সেই কারণেই হয়তো এই জাদুঘরটি এত অদ্ভুত।
ওরহান পামুক ২০০৮ সালে ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ উপন্যাস প্রকাশ করার চার বছর পর, ২০১২ সালে এই জাদুঘর খুলেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, জাদুঘরটি উপন্যাসের পর জন্ম নেয়নি। বরং বলা যায়, উপন্যাসটি জাদুঘরের গর্ভ থেকেই জন্মেছিল। যে পাঠক ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’র একটি কপি হাতে নেন, তিনি তার ভেতরে একটি টিকিট পান। বইটি আপনাকে কেবল একটি গল্প পড়তে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে না; সে আপনাকে একটি জায়গায় যাওয়ার নিমন্ত্রণও দিচ্ছে। এখানে সাহিত্য আর জাদুঘরের মাঝখানে যে দেয়ালটি সাধারণত থাকে, পামুক সেটি ভেঙে দিয়েছেন। কিন্তু দেয়াল ভাঙার পর প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়েছে—একটি গল্পের স্মৃতি কি সত্যিই একটি বস্তুর মধ্যে বাস করতে পারে? পামুক প্রথমে রসদ সংগ্রহ করেছিলেন, তারপর সেই জিনিসগুলোর চারপাশে একটি পৃথিবী তৈরি করেছিলেন এবং সেই পৃথিবীর মধ্যে বসিয়েছিলেন কেমালকে, যে প্রেমে পড়েছিল ফুসুনের।
একটি কানের দুল, চামচ, লবণের পাত্র, পুরোনো ঘড়ি, পোশাক, সিনেমার টিকিট কিংবা সিগারেট—প্রেমিকাকে হারানোর পর কেমাল যেন প্রেমিকার বদলে তার ছায়াগুলো সংগ্রহ করতে শুরু করল। মানুষ মিথ্যা বলতে পারে, স্মৃতি মিথ্যা বলতে পারে, কিন্তু একটি জিনিস—যতক্ষণ পর্যন্ত হাতে থাকে—চুপ করে থাকে। সে কোনো ব্যাখ্যা দেয় না, শুধু বলে—আমি সেখানে ছিলাম। একটি পুরোনো সিনেমার টিকিটের দাম না থাকলেও, বহু বছর পর পুরোনো কোটের পকেট থেকে বেরিয়ে এলে তা সেই সময়টিকে ফিরিয়ে আনে। এইখানেই পামুকের জাদুঘরের আসল রহস্যের চাবি। কেমালের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সে সুখকে সুখী হওয়ার সময় চিনতে পারেনি। যখন সেই দিন চলে যায়, তখন বুঝতে পারে—সেটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে মধুর মুহূর্ত। পামুক এই কাজটিকেই বলেছেন—সময়ের স্থান হয়ে ওঠা।
জাদুঘরের সবচেয়ে অদ্ভুত প্রদর্শনীগুলোর একটি হলো ফুসুনের ধূমপান করা ৪,২১৩টি সিগারেটের অবশিষ্টাংশ। প্রতিটি সিগারেট বছর ও তারিখ অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। এখানে সিগারেট আর সিগারেট নেই, এগুলো সময়ের ক্ষুদ্র কঙ্কাল। একটি জ্বলেছিল কোনো এক সন্ধ্যায়, আরেকটি হয়তো কোনো কথোপকথনের সময়। এখন কাচের বাক্সের ভেতরে তারা পাশাপাশি শুয়ে আছে, যেন একটি মৃত প্রেমের কবরস্থানে ৪,২১৩টি ছোট সমাধিফলক। একজন তুরস্ক-বিশেষজ্ঞ তরুণ গবেষক মন্তব্য করেছিলেন—‘এটি যেন একটু বেশি নিখুঁত।’ সবকিছু সাজানো, সবকিছু পরিকল্পিত। পুরোনো জিনিসের রং, কাচের বাক্স, দেয়ালের সংখ্যা, আলো—সবকিছু এমনভাবে রাখা যেন আমরা এমন একটি অতীতের কথা মনে করি, যা আসলে আমাদের কখনো ছিল না।
পামুকের নিজের জীবনও যেন একটি ঘড়ির দুই মুখের মতো। জাদুঘরে কেমালের একটি অটোমান পকেটঘড়ি আছে, যার দুটি মুখ—একটি তুরস্কের সময় দেখায়, অন্যটি ইউরোপের। ঘড়িটির নাম—‘দ্য ইস্ট-ওয়েস্ট ওয়াচ’। এটি কি কেবল একটি পুরোনো ঘড়ি? নাকি পামুক নিজেকেই সেখানে রেখে দিয়েছেন? একজন তুর্কি লেখক, যিনি ইস্তাম্বুলে দাঁড়িয়ে নিউইয়র্কের দিকে তাকান, আবার নিউইয়র্কে থেকেও ইস্তাম্বুলের পুরোনো বাড়িগুলোর কথা ভাবেন। সম্ভবত ঘড়িটি পরিচয়ের দ্বন্দ্বও দেখায়। রাষ্ট্রীয় জাদুঘর সাধারণত বলে—‘এই হল আমাদের ইতিহাস।’ পামুকের জাদুঘর যেন বলে—‘এই আমারই ইতিহাস।’ এই পার্থক্যটি ছোট নয়। একজন সাধারণ মানুষ সংরক্ষণ করে একটি চায়ের কাপ, একটি জামা, একটি পুরোনো ছবি, একটি প্রেমপত্র। রাষ্ট্রের ইতিহাসে হয়তো এসবের কোনো মূল্য নেই, কিন্তু মানুষের জীবনে কখনো কখনো এগুলোই সব।
ইস্তাম্বুলের চুকুরজুমার সেই পুরোনো বাড়িটি, যেটিকে ওরহান পামুক একটি জাদুঘরে পরিণত করেছেন, সেখানেই নোবেলজয়ী এই লেখক কথা বললেন স্মৃতি, প্রেম, বস্তু ও জাদুঘর নিয়ে। চলতি বছর নেটফ্লিক্সে সিরিজ হিসেবে গল্পটি নতুন করে পৌঁছে গেছে আরও বড় দর্শকের কাছে। নোবেলজয়ী লেখক ওরহান পামুক নিজে জাদুঘরে ইউরোনিউজের তুর্কি দলের সদস্যদের স্বাগত জানান। সাক্ষাৎকারে তিনি ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ উপন্যাসের অন্তর্নিহিত দর্শন, বস্তুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা স্মৃতির শক্তি এবং ভবিষ্যতে এই জাদুঘরের উত্তরাধিকার নিয়ে তার ভাবনার কথা তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকারটি ওরহান পামুক ৫ জুলাই ২০২৬ সালে ‘ইউরোনিউজ’-এ প্রকাশিত হয়। ওরহান পামুকের পাঠকদের জন্য দৈনিক এদিন সাক্ষাৎকারটি বাংলা ভাষায় পড়ার আমন্ত্রণ জানায়। সাক্ষাৎকারে পামুক বললেন, কীভাবে একটি পুরোনো সিগারেটের বাক্স, লবণের পাত্র, ছবি কিংবা সিনেমার টিকিট হঠাৎ বহু বছর আগের ভুলে যাওয়া স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে। তার কাছে জাদুঘর শুধু পুরোনো জিনিস রাখার জায়গা নয়; এটি মানুষের ব্যক্তিগত ও শহরের সম্মিলিত স্মৃতিরও এক আশ্রয়।

