২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের লক্ষ্য বাংলাদেশের। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কোথায় কী সমস্যা রয়েছে, তা জানতে গবেষণাটি করা হয়। সরকারি হাসপাতালে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রামের মতো রোগনির্ণয়ের (রেডিও ইমেজিং) যন্ত্র থাকলেও সেগুলো নিয়মিত সেবা দিতে পারছে না। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, জেলা, উপজেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মিলিয়ে ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের ৫২ শতাংশ রোগনির্ণয় যন্ত্র গত এক বছরে ব্যবহৃতই হয়নি। যদিও জেলা হাসপাতালগুলোতে এসব সেবার প্রাপ্যতা কাগজে-কলমে ৮৫ শতাংশ, কিন্তু বাস্তবে গত এক বছরে নিয়মিত সেবা চালু ছিল মাত্র ৩৩ শতাংশ।
গবেষণাটি পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি দল পরিচালনা করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের অর্থায়নে ৯ মাস ধরে দেশের আট বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে এই জরিপ ও পর্যালোচনা করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সব পর্যায়ের হাসপাতালে রোগনির্ণয় যন্ত্রের সেবা পাওয়ার হার ৬৫ শতাংশ হলেও বাস্তবে নিয়মিত সেবা পাওয়া গেছে মাত্র ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাপ্যতা ৪৬ শতাংশ হলেও সেবা মিলেছে ১৭ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ৫৪ শতাংশ প্রাপ্যতা থাকলেও সেবার হার ছিল ২৫ শতাংশ।
সেবা না পাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে ৭৯ শতাংশ ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি অকেজো থাকাকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া ১৪ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি এবং ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্টের অভাব রয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের অনুমোদিত ৬ হাজার ৪০৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩ হাজার ৮৯২ জন। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ পদ শূন্য। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শূন্য পদের হার ২৭ শতাংশ, জেলা হাসপাতালে ১২ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ৩৬ শতাংশ। ফলে অনেক হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী নেই।
গবেষণায় সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধেরও বড় ধরনের ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। অকেজো বা নষ্ট যন্ত্রপাতি নিয়ে মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়। ২০২৩ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে ঢাকার তিনটি প্রধান হাসপাতালের নষ্ট যন্ত্রপাতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বলা হয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে ২৩৮টি যন্ত্র নষ্ট ছিল, যেগুলোর আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা। একই বছর ১৪ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছোট-বড় ৫৩৭টি যন্ত্র নষ্ট। সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকার কারণে মানুষ সেবাবঞ্চিত হয়। এতে কষ্ট বাড়ে দরিদ্র মানুষের। মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ১২ শতাংশ ওষুধ মজুত থাকে, যেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৩ শতাংশ এবং জেলা হাসপাতালে ২৪ শতাংশ। কেন্দ্রীয় সরবরাহে ঘাটতি থাকায় হাসপাতালগুলোকে ৩৩ শতাংশ ওষুধ বাইরের উৎস থেকে কিনতে হচ্ছে। এছাড়া গজ, তুলা ও সিরিঞ্জের মতো সরঞ্জাম থাকলেও জরুরি চিকিৎসার অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ যেমন টুর্নিকেট, ব্যাগ-ভাল্ভ-মাস্ক ও নবজাতকের নাভির ক্ল্যাম্পের অভাব রয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনা অনুষ্ঠানে বলেন, পরিকল্পনার অভাবে অনেক দামি যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকেরা সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন না করে ক্লিনিকে কমিশন বাণিজ্যে যুক্ত থাকলে ভালো স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে জরিপভুক্ত হাসপাতালগুলো তাদের বাজেটের ৮৫ শতাংশ ব্যয় করেছে, তবে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেরই কিছু অর্থ অব্যয়িত থেকে গেছে। পিপিআরসির পক্ষ থেকে স্বল্প মেয়াদে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের শূন্য পদ পূরণ এবং বাজেট ব্যয়ের ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

