সৌদি আরব বর্তমানে এক ভয়াবহ উভয় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে রিয়াদ এই সংঘাত থেকে নিজেকে দূরে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিন দিক থেকে হামলার শিকার হওয়ার পর দেশটির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। সৌদি আরব এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিলে ইরান-সমর্থিত ইরাকি প্রক্সি মিলিশিয়াদের ওপর পাল্টা হামলা শুরু করেছে, যাদের বিরুদ্ধে রিয়াদের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সৌদি আরব কি সামরিক প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে, নাকি সংঘাত কমাতে অর্থ বা অন্য কোনো কৌশলের আশ্রয় নেবে?
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের প্রেক্ষাপট বেশ গভীর। পাঁচ মাস ধরে চলমান এই সংঘাতে একদিকে রয়েছে ইরান এবং তাদের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি)। তাদের মিত্রদের মধ্যে রয়েছে ইয়েমেনের হুতিরা, যারা ২০১৪ সালে দেশটির বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে নেয়। এ ছাড়া ইরানের সমর্থন রয়েছে ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস-এর প্রতি। অভিযোগ রয়েছে, এই আধাসামরিক বাহিনী সৌদি আরবের ওপর প্রায় ৩০টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং এখন তারাই সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু। লেবাননের হিজবুল্লাহও এই বলয়ের অংশ, তবে তারা বর্তমানে অপেক্ষাকৃত নীরব অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তাদের শক্তিশালী সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বাহিনী এবং বিভিন্ন মাত্রায় উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো ও জর্ডান। ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও বর্তমানে ইরাকের সঙ্গে এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মূলত জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে কেন্দ্রীভূত করেছে। একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের নতুন নিয়ম ও নির্ধারিত রুট এড়িয়ে চলা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে। ইরাকের মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যা একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়।
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী 'ভিশন ২০৩০' কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই সংঘাত বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে আধুনিক শিল্প ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের যে পরিকল্পনা তিনি নিয়েছেন, তা হুতি বা ইরান থেকে আসা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির মুখে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আবকাইক ও খুরাইসে তেল স্থাপনায় ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের হামলার ফলে সৌদি আরবের অর্ধেক তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি স্যাটেলাইট ছবিতে আবকাইক স্থাপনায় পুনরায় ড্রোন হামলার চিহ্ন দেখা গেছে, যা দেশটির অবকাঠামোগত ঝুঁকির প্রমাণ দেয়।
তেল রপ্তানি এখনো সৌদি অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। ফেব্রুয়ারিতে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগর উপকূলে ইয়ানবু রপ্তানি টার্মিনালে পাঠাতে শুরু করে। সেখান থেকে ট্যাংকারে করে তেল আরব সাগর পেরিয়ে এশিয়ার বাজারে পৌঁছানোর পরিকল্পনাটি শুরুতে সফল মনে হলেও ১৩ জুলাই ইয়েমেনের সানার বিমানবন্দরে সৌদি হামলার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এর জবাবে হুতিরা আভা ও জিজান বিমানবন্দরে হামলা চালায় এবং লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে। বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় এশিয়ায় তেল রপ্তানিও এখন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সাত বছর ধরে হুতিদের দমনে বোমা হামলা চালিয়েও সফল না হওয়া সৌদি আরব এখন উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় দিক থেকেই নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হুমকির মুখে দাঁড়িয়েছে, যা ভিশন ২০৩০-এর পরিকল্পনায় ছিল না।
ভিশন ২০৩০-এর পরিকল্পনায় ছিল না এমন বাস্তবতাসৌদি আরব সাত বছর ধরে হুতিদের দমন করতে বোমা হামলা চালিয়েও সফল হয়নি। ইয়েমেনে চলা সেই যুদ্ধ ছিল আমাদের সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি, যার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। ২০২২ সালে সৌদি আরব হুতিদের সঙ্গে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এমনও খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, সংঘাত কমাতে কিছু আর্থিক সমঝোতাও হয়েছিল। কিন্তু এখন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ধনী দেশ সৌদি আরব আবারও দক্ষিণে ইয়েমেন থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার এবং উত্তরে ইরাক থেকে আসা হামলার দ্বিমুখী হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে। ভিশন ২০৩০-এর পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় এমন পরিস্থিতির কথা কেউ কল্পনাও করেনি।

