ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী এই সংসদের অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ভিত্তি হিসেবে আইন প্রণয়ন করা। তবে ২৭ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা এই ৯ কার্যদিবসের অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অধিবেশনটিতে আইন প্রণয়নে তাড়াহুড়া এবং পরমতসহিষ্ণুতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে, যদিও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট জ্বালানি, গ্যাস ও সারসংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দল নিজ নিজ অবস্থান ও প্রস্তাব তুলে ধরেছে। বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে আনা হয়নি।
অধিবেশন চলাকালে ৯ কার্যদিবসের অধিবেশনে ৬টি বিল উত্থাপন করে সেগুলো পাস করা হয়েছে। সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন বিধিতে ১৫০টির বেশি নোটিশ দিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। মন্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৬৭৮টির উত্তর পাওয়া গেছে। এছাড়া ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ৩৫টি গঠিত হয়েছে। তবে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মূল বিরোধ দেখা দিয়েছে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন এবং সংস্কার–সংশ্লিষ্ট তিনটি বিল পাসের প্রক্রিয়া নিয়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অনেকগুলোই বিল আকারে আনার সময়সীমা পার হওয়ায় কার্যকারিতা হারিয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি সংসদের প্রথম অধিবেশনে ৯১টি বিল পাস হয়েছিল।
তৃতীয় অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধে নতুন দুটি বিল পাস হলেও বিরোধী দল এগুলোর তীব্র বিরোধিতা করেছে। তারা সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কারের পক্ষে। দ্বিতীয় অধিবেশনে (১৩ জুলাই) সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত ওই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন বিলগুলো দুর্বল। এই বিলগুলোর প্রতিবাদে বিরোধী দল ওয়াকআউটও করেছিল। নতুন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে তদন্তের ভার শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এছাড়া র্যাব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠনের বিলটিও নাম পরিবর্তনের ‘সাইনবোর্ড’ বলে বিরোধী দল সমালোচনা করেছে।
সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দিয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের আসন প্রায় ২৬ শতাংশ। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির মধ্যে ১০টিসহ মোট ১৪টি সভাপতি পদ পাওয়ার কথা বিরোধী দলের। বিএনপি এই প্রস্তাবে একমত ছিল। সরকারি দল সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি না থাকাকে এর কারণ হিসেবে দেখিয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ার বিষয়ে দুই দফা প্রশ্ন তুলেছেন। এটিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চেতনার আলোকে দেখা উচিত। অধিবেশনের শেষের দিকে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ ও সহিষ্ণুতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্য ঘিরে সরকারি দলের হট্টগোলের ঘটনায়।

