শীতলক্ষ্যায় দুজনকে বাঁচিয়ে প্রাণ গেল তরুণের, উদ্ধার ২ লাশ

নরসিংদীর শিবপুরে শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নেমে স্রোতের তোড়ে ভেসে যাওয়া স্বজনদের বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন দিলেন মো. সৌরভ মিয়া নামের এক স্থানীয় তরুণ। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক নারী ও তাঁর শিশুকে জীবিত উদ্ধার করলেও, অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে নিজেই নদীগর্ভে তলিয়ে যান তিনি। নিখোঁজের প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর আজ শনিবার সকালে ওই তরুণসহ দুজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। এ ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আরও দুজন।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর গ্রামে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। মৃত সৌরভ মিয়া ওই গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন। উদ্ধার হওয়া অপর মরদেহটি গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ভঙ্গাল এলাকার ওবায়দুল্লাহর (৩৮)। তিনি একজন সৌদিপ্রবাসী। ওবায়দুল্লাহ লাখপুর গ্রামে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে এসে পরিবার নিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসলে নেমেছিলেন। এ ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন তাঁর দুই স্বজন শান্তা আক্তার (২৫) ও মো. শান্ত মিয়া (২৪)।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুর ১২টার দিকে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে লাখপুরে শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসেন ওবায়দুল্লাহ। পরে বেলা দুইটার দিকে পরিবারের ছয় সদস্য শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে যান। গোসলের একপর্যায়ে শান্তা আক্তার তীব্র স্রোতের তোড়ে নদীতে তলিয়ে যেতে থাকেন। তাঁকে টেনে ধরে রাখতে গিয়ে নিজের সন্তানসহ পানিতে হাবুডুবু খেতে শুরু করেন তাঁর বোন শাহীনুর আক্তার। এ সময় ওবায়দুল্লাহ ও শান্ত তাঁদের উদ্ধার করতে এগিয়ে গেলে একে একে সবাই নদীতে তলিয়ে যাচ্ছিলেন।

নদীর পাড় থেকে এই দৃশ্য দেখে তাঁদের বাঁচাতে তাৎক্ষণিকভাবে নদীতে ঝাঁপ দেন স্থানীয় তরুণ সৌরভ। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে শাহীনুর আক্তার ও তাঁর শিশুসন্তানকে টেনে পাড়ে তুলে আনেন। এরপর অন্যদের উদ্ধার করতে তিনি আবারও নদীতে নামেন, কিন্তু তীব্র স্রোতের কারণে নিজেই তলিয়ে যান। পরে স্থানীয় লোকজন নদীতে নেমে খোঁজাখুঁজি করলেও কারও সন্ধান পাননি।

খবর পেয়ে গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে উদ্ধার অভিযান শুরু করে শিবপুর ফায়ার সার্ভিস। তবে তীব্র স্রোতের কারণে প্রথম দিন সন্ধ্যার আগে পর্যন্ত চেষ্টা করেও নিখোঁজ চারজনের সন্ধান মেলেনি। আজ শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে ভৈরব থেকে আসা ডুবুরি দলকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়। সকাল ১০টার দিকে ডুবুরিরা নদী থেকে ওবায়দুল্লাহ ও সৌরভ মিয়ার লাশ উদ্ধার করেন।

অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা শাহীনুর আক্তার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, শান্তা তলিয়ে যাচ্ছিল দেখে তিনি তাকে টেনে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। পরে নিজেও তলিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর স্বামী ও ভাগনে তাঁদের বাঁচাতে গিয়ে ডুবে যান। সৌরভ নামের ছেলেটি ঝাঁপ দিয়ে বাচ্চাসহ তাঁকে পাড়ে তোলে। তাদের বাঁচানোর পর অন্যদের বাঁচাতে আবারও নদীতে নেমে সে-ও ডুবে যায়।

শিবপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আবুল কাশেম জানান, তীব্র স্রোতের কারণে গতকাল ভালোভাবে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। আজ সকালে ভৈরবের ডুবুরি দলসহ পুনরায় অভিযান শুরু করে এ পর্যন্ত দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ অপর দুজনকে উদ্ধারে এখনো নদীতে অভিযান চলছে। শিবপুর থানার উপপরিদর্শক নাদিম হাসান জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া দুজনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।