দেশ পরিচালনায় বর্তমান বিএনপি সরকার বিগত ছয় মাসে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে মনে করছে দেশের বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল। জামায়াতে ইসলামীসহ একাধিক দলের শীর্ষ নেতারা অভিযোগ করেছেন, গণভোটের রায় অস্বীকার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণার মধ্য দিয়ে এই সরকার যাত্রা শুরু করেছে। সর্বত্র দলীয়করণ, চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলোর পরামর্শ নিয়ে সুন্দরভাবে দেশ পরিচালনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এই সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো গণভোটের রায়কে সরাসরি অস্বীকার করা, যা জনগণের সঙ্গে স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নিজে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিতে বললেও এখন নিজের কথা নিজেই ভঙ্গ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, গত ছয় মাসে সরকারের কোনো সফলতা খুঁজে পাওয়া যায়নি; বরং সর্বত্র সিন্ডিকেট, দলীয়করণ ও দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। এমনকি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল নিজেই ঘুস-দুর্নীতির সার্টিফিকেট দিয়েছেন। গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, সরকার বিরোধী দলের কোনো অস্তিত্ব স্বীকার করতে চায় না। বিভিন্ন কার্ড, ঠিকাদারি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল নিজেদের দলীয় লোকদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রিসভার অদক্ষতা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট এবং নিত্যপণ্যের বাজারে চরম নৈরাজ্য চলছে। রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে এবং কেবল প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে অর্থনীতি কোনোমতে টিকে আছে। তিনি চলমান সংকট সমাধানে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার দাবি জানান।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিকুর রহমান মুজাহিদ এমপি সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমকে ‘হযবরল’ অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সারা দেশে মাদকের বিস্তার ঘটলেও তা নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র নজিরবিহীন দলীয়করণ চলছে। তিনি সরকারকে এই অবস্থান থেকে ফিরে এসে বিরোধী দলের মতকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, এই সরকারের ইতিবাচক দিক হলো রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো গুমের ঘটনা ঘটেনি এবং বিরোধী দল দমনে হাইকমান্ড থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে নেতিবাচক দিকই বেশি। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে চরম দলীয়করণ করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে তারেক রহমান গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইলেও এখন ৭০ ভাগ মানুষের ভোটকে অবৈধ বলা চব্বিশের বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। তিনি আরও বলেন, সরকারের অধিকাংশ লোক নতুন ও অদক্ষ হওয়ায় এবং সদিচ্ছার অভাবে এই ব্যর্থতা তৈরি হচ্ছে।
জামায়াতের মহিলা বিভাগের প্রধান নূরুন্নিসা সিদ্দীকা এমপি বলেন, সরকারের মধ্যে এক ধরনের ‘খাই খাই’ ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সর্বত্র চাঁদাবাজি, দলীয়করণ ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। সরকারের অভ্যন্তরীণ মারামারি ও বিশৃঙ্খলা দেখে তারা পুরো মেয়াদ পূরণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) চেয়ারম্যান ব্যরিস্টার তাসমিয়া প্রধান এমপি বলেন, সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে মিথ্যা ও প্রতারণার মাধ্যমে এই সরকার যাত্রা শুরু করেছে। তাদের ৩১ দফায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও শুরুটা ভালো হয়নি। ৫ আগস্টের পর মানুষ যে পরিবর্তন চেয়েছিল, দলীয়করণের কারণে তা ব্যাহত হচ্ছে। তিনি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের তাগিদ দেন।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ছয় মাস একটি সরকারের মূল্যায়নের জন্য কম সময় নয়। তবে এই অল্প সময়েই পূর্ণাঙ্গ হিসাব করা কঠিন। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য ও সুশাসনের সূচক বিবেচনায় নিলে বর্তমান পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের চেয়েও খারাপ। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে বহু কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং বেকারত্ব আরও বেড়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মিতব্যয়িতা, সাদামাটা জীবনযাপন, খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষামূলক উদ্যোগের প্রশংসা করেন। সামগ্রিকভাবে সরকারের গতি ও অগ্রগতিকে তিনি হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান অভিযোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার ওপর ভর করে ক্ষমতায় এসে বিএনপি মাত্র ছয় মাসেই সেই চেতনার সঙ্গে বেঈমানি করেছে। নির্বাচনের আগে দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও ইতোমধ্যে দুই দফা দাম বাড়ানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি মানুষের মনে নতুন করে হতাশা তৈরি করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, গণআকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে কোনো সরকারই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০০: ৪৮আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০০: ৫৯
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, নির্বাচিত সরকারকে মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস কম সময় নয়। ছয় মাস হলো সরকারের মেয়াদকালের ১০ ভাগের এক ভাগ। তবে ছয় মাসেই সরকারের পূর্ণাঙ্গ সফলতা বা ব্যর্থতার হিসাব করা ঠিক হবে না।

