রক্তপাতহীন রাজনৈতিক সমাধান চেয়েছিলেন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ মনোভাব, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও ৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর। তিনি মনে করেন, সরকার যখন জনগণকে প্রতিহত করার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই সেনাবাহিনী দিয়ে গণ-আন্দোলন দমন করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বিএনপির নেতাদেরও বহুবার বলেছিলেন, সেনানিবাস জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ না করলে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। জুলাই আন্দোলনে সেনাবাহিনী মাঠে নামার পর জনগণ তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নেয়নি, বরং সেনাসদস্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, যা সৈনিকদের প্রভাবিত করেছে। নিজের দেশের সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানো একজন সৈনিকের জন্য সহজ নয় এবং বাহিনীর ভেতর থেকে এমন বার্তা এসেছিল যে নির্বিচার গুলি চালানোর নির্দেশ গ্রহণযোগ্য হবে না।

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান কর্মকর্তাদের নিয়ে দরবার ডাকেন। ফজলে এলাহী আকবর মনে করেন, সেই বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ অধীনস্থ কর্মকর্তা ও সৈনিকদের মানসিক অবস্থান সম্পর্কে সেনাপ্রধান পরিষ্কার চিত্র পেয়েছিলেন। ৪ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে সেনাপ্রধান তাকে ফোন করে পরদিন সকাল ১০টায় দেখা করতে বলেন। ৫ আগস্ট সকালে সেনাপ্রধানের বাসভবনে বৈঠকে তিনি তিনটি বিষয় স্পষ্ট করেন: তিনি আর কোনো রক্তপাত চান না, তিনি নিজে ক্ষমতা নিতে চান না এবং চলমান সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধান চান। সেনাপ্রধান তাকে প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে এবং আলোচনার জন্য প্রস্তুত করতে বলেন।

সেনাপ্রধানের বাসভবন থেকে বেরিয়ে তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির অন্যান্য নেতা, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না ও জোনায়েদ সাকির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বেলা সোয়া একটা বা দেড়টার দিকে সেনা সদর থেকে তাকে জানানো হয় যে রাজনৈতিক নেতাদের দ্রুত সেনাপ্রধানের দপ্তরে আসতে হবে। তিনি যখন সেনা সদরে পৌঁছান, সেখানে জি এম কাদের, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, শফিকুর রহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না, জোনায়েদ সাকি ও মাওলানা মামুনুল হকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। একপর্যায়ে সেনাপ্রধান জানান যে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন এবং একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

সেনা সদর থেকে বঙ্গভবনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তিনি জানান, সেনাপ্রধান ও রাজনৈতিক নেতারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলতে সেখানে যান। বৈঠকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানান এবং সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপে সেই সিদ্ধান্ত এগিয়ে যায়। এছাড়া তিনি সেখানে পুলিশ সংস্কার, আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ এবং ‘আয়নাঘর’ থেকে বন্দীদের মুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি তখন আয়নাঘর সম্পর্কে বিস্ময় প্রকাশ করলে ডিজিএফআই প্রধানকে বিষয়টি দেখতে বলা হয়।

ফজলে এলাহী আকবর জানান, ১৯৭৫ সালের পর থেকে তিনি সেনাবাহিনীর ভেতরে অস্থিরতা ও অভ্যুত্থানের ইতিহাস দেখেছেন। ১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষমতার পালাবদল ও সিপাহিদের প্রতিক্রিয়া তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে ৫ আগস্টের পর তিনি সেনাবাহিনীর ভেতরে অস্থিরতা রোধে কাজ করেছেন। তিনি মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থানে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সেনাবাহিনীর সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। পরিশেষে তিনি বলেন, দুর্নীতি ও অন্যায়ের যথাযথ বিচার ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণ সম্ভব নয় এবং এর জন্য স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন।