আলোর ফেরিওয়ালা পলান সরকারের উত্তরাধিকার ও আমাদের পাঠাভ্যাস সংকট

পলান সরকার কোনো ভিভিআইপি, ভিআইপি বা সিআইপি ছিলেন না, কিন্তু তাঁর অবদান ছিল এসবের চেয়েও অনেক বেশি। অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করা এই মানুষটির কাজের মূল্যায়ন কোনো দাপ্তরিক পরিমাপে করা সম্ভব নয়। নিজের জন্য তাঁর তেমন কোনো চাওয়া-পাওয়া ছিল না, কিন্তু কাজের মাধ্যমে তিনি মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছেন, তা ছিল অপরিসীম। তিনি ছিলেন আমাদের সমাজের এক সত্যিকারের পথপ্রদর্শক। জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমে দেশবাসী প্রথম এই সাদাসিধে ও কঠোর পরিশ্রমী মানুষটির সন্ধান পায়। তাঁর কোনো অর্থবিত্ত ছিল না, কিন্তু ছিল মানুষের জন্য একটি সুন্দর স্বপ্ন। পরবর্তীতে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো তাঁকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তিনি দেশজুড়ে এক ‘পরশ পাথর’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বর্তমান প্রজন্ম নবম শ্রেণির ইংরেজি বইয়েও তাঁর জীবন সম্পর্কে জানতে পারছে।

পলান সরকার চেয়েছিলেন বই পড়ার মাধ্যমে এই সমাজ আলোকিত হোক, বইয়ের ছোঁয়ায় মানুষের জীবন বদলে যাক। আর এ কারণেই তাঁকে সবাই ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ নামে চেনে। সমাজে প্রকৃত আলো ছড়াতে যে জ্ঞানের মশাল জ্বালাতে হয়, এই সত্য প্রাচীন গ্রিসের সক্রেটিস বা প্লেটোদের মতো তিনিও গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন। জ্ঞানের সেই আলো তিনি সমাজের ছোট-বড় সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এই মহান সমাজসেবক ১৯২১ সালের ১ আগস্ট নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার নূরপুর মালঞ্চী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই পিতৃহীন হওয়া এবং পরিবারের চরম আর্থিক অনটনের কারণে তিনি কেবল চতুর্থ শ্রেণি (মাইনর) পর্যন্ত পড়াশোনা করার সুযোগ পান। পরবর্তীতে তিনি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রামে নানার বাড়িতে বড় হন।

পলান সরকারের প্রকৃত নাম ছিল হারেজ উদ্দিন। নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি দিয়ে বাউসা গ্রামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বঞ্চিত হলেও বই পড়ার অভ্যাস তিনি কখনো ছাড়েননি। শরীরে ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর তিনি হাঁটার অভ্যাস শুরু করেন এবং একই সাথে নিজের টাকায় বই কিনে তা পাঠকের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এভাবেই আমৃত্যু তাঁর সকালে হাঁটা এবং বই বিলানোর কাজ একসঙ্গে চলেছে, যা পরবর্তীতে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। সমাজসেবায় এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। ২০১৯ সালের ১ মার্চ পলান সরকার ইহলোক ত্যাগ করেন। তবে তাঁর রেখে যাওয়া পাঠাগারটি এখনো সচল রয়েছে, যেখান থেকে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বই সংগ্রহ করে এবং পড়া শেষে আবার ফেরত দিয়ে যায়। একুশে পদকের সাথে পাওয়া অর্থ তিনি ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে রেখে গেছেন, যার লভ্যাংশ দিয়ে বর্তমানে এই পাঠাগারটি পরিচালিত হয়।

পলান সরকার বই পড়াকে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গেলেও আমাদের বর্তমান বাস্তবতায় বই পড়ার অভ্যাস ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এক সময় বই পড়া ছিল বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঘরে ঘরে বই পড়ুয়া মানুষ ছিল, অলিতে-গলিতে বই নিয়ে আড্ডা হতো এবং প্রিয়জনকে বই উপহার দেওয়ার চমৎকার রেওয়াজ ছিল। এমনকি বিয়ের পাত্রী দেখতে গেলেও বই উপহার দেওয়ার প্রচলন ছিল। কিন্তু প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে সাথে উপহারের ধরণ বদলে গেছে এবং বই উপহার পেয়ে খুশি হওয়ার মতো মানুষের সংখ্যা এখন খুবই কম। সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের ২০২৪ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে বই পড়ার অভ্যাসে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত হতাশাজনক। ১০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। একজন বাংলাদেশি বছরে গড়ে মাত্র ৬২ ঘণ্টা বই পড়েন, যা সংখ্যার দিক থেকে ৩টিরও কম। পক্ষান্তরে, এই তালিকার শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা বছরে গড়ে ৩৫৭ ঘণ্টা এবং ভারতের নাগরিকরা গড়ে ৩৫২ ঘণ্টা বই পড়েন। শীর্ষ ১০-এর বাকি দেশগুলো হলো যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন ও নেদারল্যান্ডস।

বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন বই পড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছিলেন, বই পড়ার তিনটি প্রধান উপকারিতা রয়েছে—একাকিত্ব ও বিশ্রামে আনন্দ লাভ, আলাপে অলঙ্কার যোগ করা এবং বিষয়কর্ম অনুধাবন ও সম্পাদনে দক্ষতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশে পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার পেছনে অনেকেই মোবাইল ফোন বা প্রযুক্তির আগ্রাসনকে দায়ী করেন, যা পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তিতে এগিয়ে থেকেও বই পড়ার অভ্যাস ধরে রেখেছে। মূলত আমাদের দেশে নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা এবং তৃণমূল পর্যায়ে পাঠাগার গড়ে তোলার ব্যর্থতাই এর বড় কারণ। আজ দেশের উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশাল বইয়ের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ লাইব্রেরি পাওয়া না গেলেও বড় বড় মোবাইলের দোকান বা রাজনৈতিক আড্ডার জায়গা ঠিকই চোখে পড়ে। অথচ প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে মানসম্মত লাইব্রেরি থাকা অত্যন্ত জরুরি ছিল। পলান সরকার একজন সাধারণ প্রান্তিক মানুষ হয়েও যে লড়াই একাকী চালিয়ে গেছেন, তা আজ রাষ্ট্রীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে অনুপস্থিত। একটি সুস্থ সমাজ ও প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে আজ দেশের প্রতিটি গ্রামে পলান সরকারের মতো হাজারো আলোর ফেরিওয়ালার প্রয়োজন, যাঁরা প্রতিদিন সকালে মানুষের দ্বারে দ্বারে জ্ঞানের আলো পৌঁছে দেবেন।