পেশাদার ছিনতাইকারীরা এখন যেন ঢাকার রাস্তায় মৃত্যুদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই তারা শিকারের অপেক্ষায় ওত পেতে থাকে। সুযোগ বুঝে যাত্রীদের জাপটে ধরা, ভয়ভীতি দেখানো এবং বাধা পেলে আগ্রাসী হয়ে ওঠার মতো ঘটনা এখন নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে সাধারণ মানুষের প্রাণ হারানোর মতো অমানবিক ঘটনা দেশজুড়ে শোকের ছায়া ফেলছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে ৩৪২টি ছিনতাইয়ের 'হটস্পট' চিহ্নিত করা হয়েছে। অপরাধপ্রবণ এলাকার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মোহাম্মদপুর ও উত্তরা। শুধুমাত্র মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় ১০৮টি হটস্পট রয়েছে, যেখানে ২৪০ জন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী সক্রিয়। এছাড়া উত্তরা ও গুলশান এলাকায় ৯৪টি হটস্পট চিহ্নিত হয়েছে, যার মধ্যে উত্তরা পশ্চিম ও এয়ারপোর্ট রোড অপরাধীদের অন্যতম প্রধান রুট।
পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, ঢাকায় মোট ১,৩৮৭ জন সক্রিয় ছিনতাইকারী রয়েছে। এর বাইরেও রাজধানীজুড়ে হাজারের বেশি ভাসমান ছিনতাইকারী আছে, যারা ঢাকার বাইরে থেকে এসে অপরাধ সংঘটন করে আবার ফিরে যায়। অঞ্চলভিত্তিক সক্রিয় অপরাধীর সংখ্যা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওয়ারীতে সর্বোচ্চ ৩০৮ জন, তেজগাঁও ও উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন করে, মতিঝিলে ১৬৮ জন, রমনায় ১৫২ জন এবং লালবাগে ১৫১ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। তবে গুলশান ও মিরপুরে এই সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী, কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে ভোরে আসা যাত্রীরা মূলত এই ছিনতাইকারীদের প্রধান টার্গেট। বিশেষ করে রিকশাযাত্রী বা পথচারীদের গতিবিধি অনুসরণ করে নির্জন স্থানে সুযোগ বুঝে হামলা চালানো হয়। চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টানার ঘটনায় গত ছয় মাসে তিন নারীর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আরেক ছিনতাইকারী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ডিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ডিএমপি প্রতিটি বিভাগে টহল, পেট্রোলিং ও ফিক্সড টিমসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিটি জোনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন এবং সাদা পোশাকেও গোয়েন্দা টিম কাজ করছে।
তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধীদের দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অভাবে এই প্রবণতা কমছে না। তিনি মামলার চার্জশিট প্রস্তুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ওপর জোর দিয়ে পুলিশের টহল কার্যক্রম আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

