ইসরাইল রক্ষা ও মার্কিন আধিপত্যে নতুন ‘মক্কা চুক্তি’

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। মার্কিন আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্বার্থে দায়িত্ব পালনের জন্য একটি ‘মধ্যপ্রাচ্য’, ‘আরব’ বা ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠন করার যে পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের ছিল, এই চুক্তিকে তারই অংশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে এই চুক্তি নিয়ে নানামুখী ব্যাখ্যা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলপন্থী কিছু বিশ্লেষক একে তেলআবিবের বিরুদ্ধে একটি জোট হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও, অন্য একটি পক্ষের ধারণা—সৌদি ও তার আরব প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা দিতে ওয়াশিংটনের ব্যর্থতার পর রিয়াদ নতুন নিরাপত্তা নিশ্চয়তাদাতা খুঁজছে এবং এই চুক্তি তারই ইঙ্গিত।

বাস্তবে এই মক্কা চুক্তি শীতল যুদ্ধের শুরুর দিক থেকেই চলে আসা একটি মার্কিন নীতির সর্বশেষ সংস্করণ মাত্র। এই নীতির মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমাপন্থী বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা, তাদের মার্কিন পৃষ্ঠপোষক এবং তাদের নীরব মিত্র ইসরাইলকে সুরক্ষিত রাখা। ফলে এই ব্যবস্থার প্রকৃত লক্ষ্য যে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শত্রুরাই, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তিন দেশ সম্প্রতি এবং শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে সই করায় তিনি খুবই খুশি। নতুন এই চুক্তিটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৫৫ সালে গঠিত সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (সেন্টো) আদলে তৈরি হয়েছে, যা ‘বাগদাদ প্যাক্ট’ নামেই বেশি পরিচিত ছিল।

মক্কা চুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক দিন আগে, গত ৩০ জুলাই সৌদি আরব আরও ১৩টি দেশকে নিয়ে একটি নতুন সামরিক জোট গঠন করে। বাহরাইন, বাংলাদেশ, কোমোরোস, জিবুতি, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, পাকিস্তান, কাতার, সোমালিয়া, সুদান, তুরস্ক এবং সৌদি-সমর্থিত এডেনভিত্তিক ইয়েমেন সরকারসহ মোট ১৪টি দেশের সমন্বয়ে রিয়াদে গঠিত হয় ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ (এমএমডিএ)। এই জোটের লক্ষ্য লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরের নৌ ও জ্বালানি সরবরাহপথ নিরাপদ রাখা। ইয়েমেনের হুতি বা আনসারুল্লাহ আন্দোলনের নৌ অবরোধের হুমকি ও হামলার পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত এই জোট মূলত মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’-এরই উত্তরসূরি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র মিসর ও জর্ডান কেন নতুন মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, মিসর এখনো বিষয়টি নিয়ে নিজেদের অবস্থান বিবেচনা করছে। তবে দুটি দেশের অনুপস্থিতি হয়তো এমন একটি আশঙ্কার ইঙ্গিত দেয় যে, বর্তমান চুক্তির সদস্যরা ভয় পাচ্ছে—মিসর বা জর্ডান ইসরাইলি আগ্রাসনের শিকার হলে তাদের সেখানে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে বলা হতে পারে। ইসরাইলের অব্যাহত যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। অন্যদিকে, কিছু ইসরাইলপন্থী বিশ্লেষক মনে করছেন, নতুন চুক্তিটি ইসরাইল এবং সাম্প্রতিক আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশীদারদের দুর্বল করে দিতে পারে, কারণ তাদের এই নতুন জোটে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো স্টিভেন এ কুক দাবি করেছেন, ট্রাম্পের কিছু হঠকারী কর্মকাণ্ডের কারণে সৌদি আরব ওয়াশিংটনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে এবং তারা অন্য বিকল্প খুঁজছে। তার মতে, নতুন নিরাপত্তা অংশীদাররা এমন একটি নতুন ব্যবস্থা চাইছে, যেখানে ওয়াশিংটন নয়, তারাই অঞ্চলটির গতিপথ নির্ধারণ করবে। তবে এই বিশ্লেষণের মূল সমস্যা হলো, তুরস্ক নিজেই ন্যাটোর সদস্য এবং সৌদি ও পাকিস্তানও দীর্ঘদিনের মার্কিন সামরিক মিত্র। ফলে এই তিন দেশের জোট কীভাবে ওয়াশিংটনের নির্দেশনা বা মার্কিন কর্তৃত্বের বাইরে গিয়ে নিজেদের মতো করে পদক্ষেপ নেবে, তা বাস্তবসম্মত নয়।

কুক আরও দাবি করেন যে, মক্কা চুক্তি ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দুটি আলাদা ব্লক তৈরি হতে পারে। কিন্তু মক্কা চুক্তি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক। কারণ তুরস্কের সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবও বছরের পর বছর ধরে তেলআবিবের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে আসছে এবং ১৯৮১ সাল থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলকে এই অঞ্চলের সঙ্গে একীভূত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সৌদিকে ইসরাইলের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয় না এবং সৌদিও ইসরাইলকে শত্রু ভাবে না। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই রকম হতো, যদি ইসরাইল তাদের প্রধান শত্রু ভারতের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র না হতো।

দোহাভিত্তিক মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক খালিদ আল-জাবের মনে করেন, নতুন চুক্তিটি একটি সতর্কবার্তা যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে গেলে অঞ্চলটি কেবল ইসরাইল ও ইরানের একচেটিয়া আধিপত্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারে। তাই মক্কা চুক্তিকে একটি তৃতীয় শক্তিকেন্দ্র গঠনের প্রাথমিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যুক্তিসঙ্গত, যার যথেষ্ট শক্তি থাকবে যাতে কোনো একটি পক্ষ অঞ্চলটির ওপর একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে।

কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন কথা বলে। গত নভেম্বরেই সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন, যেখানে সৌদিকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ মর্যাদা এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। তুরস্ক এখনো ন্যাটোর সক্রিয় সদস্য এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও ট্রাম্পের পোস্টের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। অর্থাৎ বাস্তবে কোনো তৃতীয় শক্তিকেন্দ্র নেই। মক্কা চুক্তি মূলত হালনাগাদ বাগদাদ প্যাক্টেরই একটি অংশ, যার লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য ও ইসরাইলের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। ট্রাম্পের একে ‘বড়, সাহসী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ’ বলে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়েই এই চুক্তির আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।