বিমান ক্রুদের আড়ালে আকাশপথে হুন্ডি সিন্ডিকেটের শতকোটি টাকার কারসাজি

ঝকঝকে ইউনিফর্মের আড়ালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভেতরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল হুন্ডি সিন্ডিকেট। জাতীয় পতাকাবাহী এই এয়ারলাইন্সের দুবাই স্টেশনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই আর্থিক অপরাধের মাধ্যমে কেবিন ক্রুদের একটি চক্র অন্তত শতকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ডিজিএফআই এবং বিমানের অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে এই নজিরবিহীন অর্থ পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, রাষ্ট্রবিরোধী এই কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সংস্থাটি তার গৌরব হারাবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম জানান, কেবিন ক্রুদের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার বা হুন্ডির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তিনি বলেন, ক্রুরা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও নিয়মকানুন সম্পর্কে অবগত থাকেন, তাই এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বহন করলে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি এই চক্রের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করতে এবং দুবাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক হাব থেকে অর্থ লেনদেনের পুরো চেইন অনুসন্ধান করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিদেশে কর্মরত কেবিন ক্রুদের ওভারসিজ ভাতা তাদের নিজ নিজ নামে সংশ্লিষ্ট দেশের ব্যাংক থেকে উত্তোলনের নিয়ম থাকলেও দুবাই স্টেশনে তা মানা হয়নি। ১৪ মে জনতা ব্যাংক পিএলসি-এর দুবাই শাখা থেকে একটি মাত্র একক চেকের (চেক নং-৯৪১৩২৬) মাধ্যমে ১৯৬ জন কেবিন ক্রুর বকেয়া ও ওভারসিজ ভাতা বাবদ ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ দিরহাম বা প্রায় ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা একবারে উত্তোলন করা হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ইমপ্রেস্ট অ্যাকাউন্ট থেকে ইস্যু করা এই চেকটি ফ্লাইট স্টুয়ার্ড এফএস শাকুরের নামে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিমানের অর্থ বিভাগের তৎকালীন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রচলিত পদ্ধতি উপেক্ষা করে এই সম্মিলিত অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন দেন এবং দুবাই স্টেশনের ফাইন্যান্স ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তোলিত এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ক্রুদের হাতে না দিয়ে দুবাইয়েই রেখে দেওয়া হয় এবং তা একজন অবৈধ হুন্ডি এজেন্টের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই জালিয়াতির নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেন কেবিন ক্রু ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক এফএস শাকুর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে উত্তরার একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট নাজমুলের সঙ্গে অবৈধ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৫ মে সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে বিজি-২৪৮ ফ্লাইটে ঢাকায় ফেরার পর শাহজালাল বিমানবন্দরে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শাকুরকে আটক করে তল্লাশি চালান। তার কাছে মাত্র ১০ হাজার মার্কিন ডলার ও ২ হাজার দিরহাম পাওয়া যায়। বাকি প্রায় ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮৭ দিরহাম (প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা) তিনি দুবাইয়ে হুন্ডি এজেন্টের কাছে হস্তান্তর করেছেন বলে স্বীকার করেন।

বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে গত দুই বছরের কারসাজির ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। এফএস শাকুর ছাড়াও এই সিন্ডিকেটে আবু সালেহ, অংকুর ও শফিউল্লাহসহ অনেকে জড়িত। তারা নিয়মিতভাবে দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ রুটের ফ্লাইট শিডিউল হাতিয়ে নিতেন এবং গত দুই বছরে অথরিটি বিলের মাধ্যমে আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন, যার সিংহভাগ লোপাট হয়েছে। এর আগে ২২ এপ্রিলও একইভাবে ১৬০ জন ক্রুর ৯ লাখ ৭৫ হাজার দিরহাম একটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এফএস শাকুর তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুললেও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।