নবীজির স্মৃতিবিজড়িত মক্কার পাঁচটি ঐতিহাসিক মসজিদ

মক্কায় পবিত্র ঘর বায়তুল্লাহর স্নিগ্ধ প্রাঙ্গণে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত মোমিন হৃদয়ের জন্য অতুলনীয় প্রশান্তির উৎস। কাবা শরিফের প্রথম দর্শনের পুণ্য যেমন মহিমান্বিত, তেমনি এই পবিত্র নগরীর অলিতে-গলিতে ও পাহাড়ের উপত্যকায় ছড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক মসজিদগুলোও বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র স্মৃতির ধারক। মক্কার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এমনই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক মসজিদের পরিচিতি এখানে তুলে ধরা হলো।

জান্নাতুল মুআল্লাহর দিকে যাওয়ার পথে আল-হুজুন এলাকায় অবস্থিত আর-রায়াহ মসজিদ। মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে আল-মসজিদ আল-হারাম সড়কের পাশে অবস্থিত এই মসজিদটির নাম আর-রায়াহ, যার ইংরেজি অর্থ ফ্ল্যাগ বা পতাকা। ইমাম বুখারি (রহ.)-এর বর্ণনামতে, মক্কা বিজয়ের সময় মহানবী (সা.) আল-হুজুনের এই নির্দিষ্ট স্থানে একটি পতাকা স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) মহানবী (সা.)-এর এই ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হজ ও ওমরাহ যাত্রীদের কাছে এটি 'ক্যাট মসজিদ' নামেও পরিচিত, যদিও এই নামের সপক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা যৌক্তিকতা আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আর-রায়াহ মসজিদ থেকে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে অবস্থিত আল-জিন মসজিদ, যা আল-হারাস মসজিদ নামেও পরিচিত। জিনদের একটি দলের কাছে মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতি কাজের স্মারক হিসেবে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। রাসুল (সা.) সাহাবি আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.)-কে নিয়ে আল-হুজুনের এই নির্দিষ্ট স্থানে গিয়েছিলেন এবং সেখানে পবিত্র কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করেছিলেন। তবে মসজিদে গিয়ে কোনো অলৌকিক বা ভূতুড়ে অভিজ্ঞতার প্রত্যাশা করা ঠিক নয়, কারণ নাম শুনে যেমনটি মনে হতে পারে, বাস্তবে সেখানে তেমন কোনো ভৌতিক অভিজ্ঞতার সুযোগ নেই।

আল-জিন মসজিদের ঠিক বিপরীতেই খুঁজে পাবেন আশ-শাজারাহ মসজিদ। বিশ্বনবী (সা.)-এর এক মহান অলৌকিক ঘটনার স্মরণে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। ওমর আল-খাত্তাব (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.) যখন আল-হুজুনে ইসলাম প্রচার করছিলেন, তখন অমুসলিমরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করলে তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমতার নিদর্শন প্রার্থনা করেন। তখন মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে একটি গাছ তাঁর কাছে এসে সালাম জানায় এবং পুনরায় স্বস্থানে ফিরে যায়। অতীতে যেখানে একটি ছোট স্মারক গম্বুজ ছিল, সেখানে এখন একটি পূর্ণাঙ্গ মসজিদ দাঁড়িয়ে রয়েছে।

শুমাইসি এলাকায় অবস্থিত হুদাইবিয়া মসজিদ, যা বায়াত আর-রিদওয়ান মসজিদ নামেও পরিচিত, মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে এবং মক্কার সীমানা থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার বাইরে অবস্থিত। হিজরি ষষ্ঠ বর্ষে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে রওনা হওয়া মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিদের পথ মক্কার সীমানায় কুরাইশ বাহিনী রোধ করে। আলোচনার জন্য ওসমান বিন আফফান (রা.)-কে মক্কায় পাঠানো হলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। এই খবর শুনে সাহাবিরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে মহানবী (সা.)-এর হাতে হাত রেখে প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ করেন, যা ইতিহাসে বায়াত আর-রিদওয়ান নামে পরিচিত। সাহাবিদের এই বীরত্বপূর্ণ দৃশ্য দেখে কুরাইশ প্রহরীরা ভয় পেয়ে ওসমান (রা.)-কে মুক্তি দেয়। বায়াত গ্রহণের সময় নবী (সা.) যে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেটি ওমর আল-খাত্তাব (রা.)-এর খিলাফতকালে কেটে ফেলা হলেও সেই জায়গায় এখন মসজিদটি নির্মিত হয়েছে, যা ওমরাহ পালনের জন্য মিকাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

মসজিদ তানঈম মক্কা থেকে মাত্র সাড়ে ৭ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এবং মক্কার সীমানার সবচেয়ে কাছে হওয়ায় এটি মদিনা থেকে আসা হজ ও ওমরাহ যাত্রীদের জন্য মিকাত হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে এটি মক্কায় প্রবেশের মূল ফটক হিসেবেও বিবেচিত হয়। মক্কার ভেতরে হামজা এবং ওমর আল-খাত্তাব (রা.)-এর মসজিদের মতো আরও অনেক ঐতিহাসিক মসজিদ থাকলেও সেগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা আজও উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।