যেভাবে গাড়িভর্তি টাকা নিয়ে সস্ত্রীক যুক্তরাষ্ট্রে পালালেন সাবেক মেয়র খোকন

বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই সেরনিয়াবাত খোকন আব্দুল্লাহর দেশত্যাগের একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রাক্কালে তিনি গাড়িভর্তি প্রায় ১৬ কোটি টাকা নিয়ে দেশ ছাড়েন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে এই বিপুল অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তার ছেলের কাছে পাঠানো হয়েছে।

৪ আগস্ট রাতে বরিশাল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন খোকন আব্দুল্লাহ। ওই দিন সকালে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে গুলি চালাতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা টুটুল চৌধুরী গণপিটুনিতে মারা গেলে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এরপর আলেকান্দা সড়কের ভাড়া বাসায় তৎকালীন এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও দুই যুবলীগ নেতাকে ডেকে নিয়ে আলোচনার পর রাত ৩টার দিকে বিশেষ একটি বাহিনীর দুটি গাড়ির নিরাপত্তায় সস্ত্রীক বরিশাল ছাড়েন তিনি। বরিশাল থেকে সোজা খুলনায় গিয়ে প্রথমে সোনাডাঙ্গায় শ্যালক মিঠুর বাসায় এবং পরবর্তীতে খুলনার এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার বাড়িতে আশ্রয় নেন। আওয়ামী লীগ আমলে ওই বিএনপি নেতাকে মোংলা বন্দরের ব্যবসায় সহায়তা করার সুবাদে তিনি এই আশ্রয় পান। সেখানে অক্টোবর পর্যন্ত অবস্থান করেন তিনি।

খুলনায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থাতেই বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) কয়েকজন ঠিকাদারের প্রায় ২৭ কোটি টাকার বকেয়া বিলে ব্যাক ডেটে (পূর্ববর্তী তারিখ) সই করেন সাবেক এই মেয়র। চেকে সই করার বিনিময়ে তিনি মোট বিলের ২০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিশন নেন। খোকনের তৎকালীন এপিএস রুবেল বরিশাল থেকে চেকগুলো খুলনায় নিয়ে সই করিয়ে আবার বরিশালে ফেরত আনেন। এই কাজে তাকে সহায়তা করেন বিসিসির প্রকৌশল ও হিসাব শাখার দুই কর্মকর্তা, যাদের একজন বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী পরিষদের নেতা। উল্লেখ্য, শেখ পরিবারের কোটায় মেয়র হওয়া খোকন মাত্র ৭ মাসের দায়িত্বে থেকে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে বর্তমানে দুদকের তদন্তের মুখে রয়েছেন।

৪ আগস্ট রাতে বরিশাল ছাড়ার আগে মাত্র ৩ ঘণ্টার প্রস্তুতিতে ঘরে থাকা নগদ ১৬ কোটি টাকা ও স্বর্ণালংকার ব্যাগে ভরেন খোকন ও তার স্ত্রী লুনা আব্দুল্লাহ। কোনো কাপড়চোপড় না নিয়ে কেবল এই বিপুল অর্থ নিয়ে তারা খুলনায় পৌঁছান। পরবর্তীতে এই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যাওয়া এক যুবলীগ নেতার কাছে পাঠানো হয়। সেখান থেকে সিঙ্গাপুরে খোকনপুত্র প্রত্যুষের নামে থাকা ভুয়া কোম্পানির অ্যাকাউন্টে এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত হয়। তবে এই প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ার ওই হুন্ডি ব্যবসায়ী ৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করায় খোকনের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়।

খুলনায় বসে চারবার ব্যর্থ হওয়ার পর, অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে সিলেটের তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতের আসামে প্রবেশ করেন খোকন। গুয়াহাটি বিমানবন্দর থেকে বিমানে চড়ে তিনি কলকাতায় পৌঁছান এবং নিউ টাউন অ্যাকশন এরিয়া-১ এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে সস্ত্রীক থাকতে শুরু করেন। সেখানে এক মাসের জন্য গাড়ি ভাড়া করে চলতেন তারা। ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর তাদের কলকাতার এক্সেস মলে ঘুরতেও দেখা যায়।

অবশেষে ডিসেম্বরের শুরুতে কলকাতা থেকে উড়োজাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে পাড়ি জমান এই দম্পতি। ট্রাম্প সরকারের গোল্ডেন ভিসা সুবিধার আওতায় প্রায় ১৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ দেখিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা সংগ্রহ করেন। টেক্সাসে ছেলে প্রত্যুষের নামে থাকা দুটি বাড়ির একটিতে তারা বসবাস করছেন। সেখানে একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও পেট্রোল পাম্প কিনে স্থায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন খোকন। বর্তমানে তার ব্যবহৃত সব ফোন নম্বর বন্ধ রয়েছে এবং দলের কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই।