দুর্নীতির আখড়ায় ডিআইএ: ছয় মাসের জন্য পরিদর্শন কার্যক্রম স্থগিত

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করেছিল পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি নিজেই দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পরিদর্শকরা নিয়মিত পরিদর্শনে গেলেও প্রতিবেদন জমা না দিয়ে ঘুষের বিনিময়ে ছাড় দিয়ে থাকেন। অঘোষিত নিয়ম অনুযায়ী, পরিদর্শনের সময় এক মাসের এমপিও’র সমপরিমাণ অর্থ ঘুষ হিসেবে আদায় করা হয়। ডিআইএ’র এমন পরিস্থিতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি বর্তমানে তলানিতে এসে ঠেকেছে।

ডিআইএ সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালে পরিদর্শন করা অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন আজও আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি প্রতিবেদন জমা না দিয়েই পুনরায় একই প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে যাওয়ার নজিরও রয়েছে। এই বিশৃঙ্খলা কাটাতে সম্প্রতি নতুন কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দুর্নীতি রোধে আগামী ছয় মাসের জন্য সব ধরনের পরিদর্শন কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং এই সময়ের মধ্যে আগের সব অডিট নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আসা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে রয়েছে গেন্ডারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন। এই তদন্ত নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন অসন্তোষ প্রকাশ করে তা বাতিল ও পুনঃতদন্তের সুপারিশ করেছেন। একই সঙ্গে সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়াও তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ১৬ই মার্চ প্রেরিত এক পত্রে সিনিয়র শিক্ষক দিলারা জাহান অভিযোগ করেন, শিক্ষা পরিদর্শক নুসরাত হাছনীন ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মো. নূরুল আফসার ঠিকানাবিহীন অভিযোগ আমলে নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করেননি। প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামকে বাঁচাতে নুসরাত হাছনীন ১০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

চাঁদপুরের ফরাক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের ২১শে মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়, গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি পরিদর্শনে এসে শিক্ষা পরিদর্শক মো. মুক্তাবুলার রহমান ও মো. সিরাজুল ইসলাম সঠিক তদন্ত রিপোর্ট দিতে ব্যর্থ হন। ফ্যাসিবাদী দালালদের প্রভাবে এখানেও ১০ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

ডিআইএ’র অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। দপ্তরের পরিচালকসহ কয়েকজনকে সরানো হলেও এখনো পুরনো সিন্ডিকেট বহাল আছে। এদের বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্য, পদায়ন, নিয়োগে অনিয়ম এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে পাঁচজন স্থায়ী কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা দীর্ঘদিন একই দপ্তরে অবস্থান করে পরিচালক ও কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে দপ্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখছেন। এমনকি বিসিএস কর্মকর্তাদের হেনস্তা করার মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা পরবর্তীতে যথাযথ তদন্ত ছাড়াই মীমাংসা করা হয়েছে।

বর্তমান পরিচালক প্রফেসর মো. আফলাতুন স্বীকার করেছেন যে, শিক্ষকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়। অনেক সময় পুরনো কাগজপত্রের অজুহাতে শিক্ষকদের ভীত করে ঘুষ নেয়া হয়। তিনি বলেন, ডিআইএ’র ভাবমূর্তি উদ্ধারে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বার্তা পাঠিয়েছেন যে, ডিআইএ কেবল পরিদর্শনের ক্ষমতা রাখে, শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের। কোনো কর্মকর্তা বা গোষ্ঠী ঘুষ দাবি করলে তাদের ধরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও ডিআইএ’র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা গ্রহণের প্রবণতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

সম্প্রতি রাজধানীর গেন্ডারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে নাখোশ হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এটি বাতিল করে প্রকৃত অভিযোগকারীর অভিযোগ আমলে নিয়ে পুনঃতদন্তকরণের সুপারিশ করেন তিনি। এ ছাড়াও তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেন সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া। ১৬ই মার্চ প্রেরিত এই পত্রে প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র শিক্ষক দিলারা জাহান লিখেছেন, ২০২৫ সালের ১৭ই মার্চ আপনার অধীনস্থ শিক্ষা পরিদর্শক নুসরাত হাছনীন ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মো. নূরুল আফসার যৌথভাবে ঠিকানাবিহীন একটি অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করেন। প্রকৃত অভিযোগকারীর অভিযোগ অবজ্ঞা করা হয়। সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, একতরফাভাবে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামকে রক্ষা করা হয়। এর জন্য নুসরাত হাছনীন ১০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ ছাড়াও চাঁদপুরের ফরাক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে তদন্তের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়। চলতি বছরের ২১শে মে’র এই পত্রে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি পরিদর্শনে আসেন শিক্ষা পরিদর্শক মো. মুক্তাবুলার রহমান ও মো. সিরাজুল ইসলাম। অভিযোগের ভিত্তিতে সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. হান্নান মিজির সকল অপকর্ম তুলে ধরা হয়। অভিযোগ মতে তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ ফ্যাসিবাদী দালালদের অনুরোধে সঠিক তদন্ত রিপোর্ট দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এতে ১০ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ করা হয়।