সীতাকুণ্ডে জাহাজ ভাঙায় ৯ মৃত্যু: কার ভুলে মিলছে ‘নিরাপদ সনদ’?

সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে গত ১৪ই আগস্ট বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাটি কেবল একটি শিল্প দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় পরিদর্শন ব্যবস্থার নানাবিধ ব্যর্থতার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। যে জাহাজটি ভাঙার সময় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে, সেটিকে ভাঙার জন্য সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে অন্তত ছয়টি সংস্থা ‘নিরাপদ’ সনদ দিয়েছিল। এই সনদ কি শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য, নাকি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য—সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, মেরিন একাডেমি এবং একটি বেসরকারি শিপ স্ট্রিপের প্রতিনিধিরা ‘এমটি রাসি’ জাহাজটি পরিদর্শন করেন। পরের মাসেই তারা জাহাজটিকে ‘নিরাপদ’ ঘোষণা করে সনদ দেয়। অথচ পরিদর্শন প্রতিবেদনে জাহাজটিতে হাইড্রোজেন সালফাইডের (H2S) মতো মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাসের কোনো অস্তিত্ব নেই বলে দাবি করা হয়। বিস্ফোরক অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা পেট্রোলিয়াম বিধিমালা অনুযায়ী কেবল পেট্রোলিয়াম-জাতীয় গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করে। অর্থাৎ, শ্রমিকদের প্রাণ কেড়ে নেয়া হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি তারা যাচাই করার প্রয়োজনই মনে করেনি।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে যে, পরিদর্শক দল জাহাজটির ডেক থেকে ‘রিফ্লেক্টর’ ব্যবহার করে ট্যাংকগুলো পর্যবেক্ষণ করেছে। ঝুঁকির কারণে তারা জাহাজের ভেতরের কফারড্যাম বা মেমব্রেন ট্যাংকে নামেননি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজের কাঠামোয় লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। অথচ পরিদর্শকরা ‘দূর থেকে’ দেখে সনদ দিয়েছেন, যা এক প্রকার চোখ বন্ধ করে রাস্তা পার হওয়ার নির্দেশ দেয়ার শামিল।

জাহাজ আমদানির সময় মালিকপক্ষের জমা দেয়া আইএইচএম (ইনভেন্টরি অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস) তালিকাতেও হাইড্রোজেন সালফাইডের কোনো উল্লেখ ছিল না। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেটিজফট এশিয়া এই তালিকা তৈরি করলেও তারা তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট জানিয়েছে যে, সব জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ সম্ভব হয়নি এবং তারা কেবল কর্তৃপক্ষ ও গ্রাহকের দেয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব তথ্যের নির্ভুলতার কোনো নিশ্চয়তা তারা দেয় না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্যমতে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে জাহাজ ভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৪৯ জন শ্রমিক। সর্বশেষ ৯ জনের মৃত্যুর পরও শিল্প-প্রশাসন কোনো শিক্ষা নিয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কাজ শুরুর আগে গ্যাস ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ তা মানেনি।

সীতাকুণ্ডের এই শিল্পাঞ্চলে জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডের পাশাপাশি সিমেন্ট কারখানা, স্টিল রি-রোলিং ও সার কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে। স্থানীয় জলাধার ও খাল দখল করে গড়ে ওঠা এসব কারখানার কালো ধোঁয়া ও শব্দদূষণ জনজীবনকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে। অ্যাসবেসটস, সিসা ও পারদের মতো ভারী ধাতুগুলো মাটির সঙ্গে মিশে ভূগর্ভস্থ পানিকে বিষিয়ে তুলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাহাজ পরিদর্শনে আধুনিক গ্যাস ডিটেক্টর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, পরিদর্শক দলে দক্ষ বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করা এবং আইএইচএম তালিকা যাচাইয়ে তৃতীয় পক্ষের নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশ আন্দোলনকারীরা। একইসঙ্গে, ক্যাশ বায়ারদের কার্যক্রম কঠোর নজরদারিতে আনা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না হলে শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত এই শিল্পে মৃত্যুঝুঁকি বাড়তেই থাকবে। ব্যবসার মুনাফার চেয়ে জনস্বাস্থ্য ও শ্রমিকের জীবনের মূল্য অনেক বেশি—এই সত্যটিই নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।