প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই চলতি কিংবা আগামী মাসের মধ্যে এই নির্বাচন শেষ করতে চায় দলটি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পদে দলের প্রার্থী মনোনয়নের যাবতীয় ক্ষমতা বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। দলটির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির এই বৈঠকটি প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট পদে দলের প্রার্থী কে হবেন, তা নির্ধারণের চূড়ান্ত দায়িত্ব তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হলেও স্থায়ী কমিটির সদস্যরা নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেননি। বৈঠক শেষে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, স্থায়ী কমিটির সভায় সর্বসম্মতভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পুরো বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য থাকায় স্পিকার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠান করা বাধ্যতামূলক। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে জানিয়েছে যে তারা নির্বাচন আয়োজনে প্রস্তুত এবং যেকোনো সময় তফসিল ঘোষণা করতে পারে। বিএনপিও তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে প্রস্তুত এবং তফসিল ঘোষণার পর কে প্রার্থী হবেন, তা নির্ধারণের দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করে ভোট গ্রহণের বিষয়েও আলোচনা হয়। তবে এ বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়নপত্র সংগ্রহ, জমা ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলবে। একক প্রার্থী থাকলে ভোটের প্রয়োজন হবে না। তবে একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদে একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকার নিয়ম রয়েছে, যা স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচন কমিশন নির্ধারণ করবে। অন্যদিকে, জাতীয় সংসদের একটি উচ্চ পর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের জন্য সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রয়োজন নাও হতে পারে। নির্ধারিত তারিখে সংসদ সদস্যরা বুথে গিয়ে সরাসরি ভোট দিতে পারবেন।
সংসদের ওই সূত্রটি আরও জানায়, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আইন ১৯৯১ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে ইসি প্রথমে স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ম্যান্ডেট নেবেন এবং অফিশিয়ালি ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের ভোটার তালিকা চাইবেন (বর্তমানে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন)। স্পিকার এই তালিকা নির্বাচন কমিশনে পাঠানোর পর কমিশন সর্বনিম্ন ৭ দিন বা তার বেশি সময় দিয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর যদি একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকেন, তবে জাতীয় সংসদে ভোটের আয়োজন করা হবে, যেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং নির্বাচনের পর গেজেট প্রকাশ করা হবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনও নিশ্চিত করেছেন যে, সংবিধানের নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, দলের কোনো সিনিয়র নেতাকেই পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেওয়া হতে পারে। দলের বাইরে থেকে কাউকে প্রেসিডেন্ট করা হচ্ছে—এমন গুঞ্জন নাকচ করে দিয়ে এক সিনিয়র নেতা জানান, দেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হবেন একজন পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ এবং এ নিয়ে দলের ভেতর ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, দায়িত্ব গ্রহণের সোয়া তিন বছরের মাথায় গত ২৪শে জুলাই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। তার পদত্যাগের পর থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন।

