বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই বিপ্লব বিরোধীরা এখনো বহাল গুরুত্বপূর্ণ পদে

জুলাই বিপ্লবের সময় স্বৈরাচার শেখ হাসিনার গদি রক্ষার লক্ষ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) একদল শিক্ষক গোপন বৈঠক করেছিলেন। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকের দুই বছর পার হয়ে গেলেও অভিযুক্ত আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। ওই বৈঠকে আন্দোলন দমন, এক দফা দাবির বিরোধিতা, আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হুমকি এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি; বরং অভিযুক্তদের অনেকেই ডিন এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

জুলাই বিপ্লবের পর অভিযুক্ত এসব শিক্ষকের বিচার চেয়ে শিক্ষার্থীরা একাধিকবার আন্দোলনে নামলেও বিগত প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতাকারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েও এই দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে। এসব আন্দোলনের মুখে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শূচিতা শরমিন পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। এরপর ২০২৫ সালের ১৪ মে অধ্যাপক ড. তৌফিক আলম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। সে সময় তদন্ত কমিটি গঠনের আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। প্রশাসনের ভাষ্যমতে, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসহযোগিতার কারণে তদন্ত এগোয়নি, তবে অভিযোগ রয়েছে যে অদৃশ্য চাপের কারণে বিচার প্রক্রিয়া থমকে গিয়েছিল।

২০২৬ সালের ১৪ মে নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মামুন অর রশীদ। জুলাই আন্দোলনের সমর্থক হিসেবে পরিচিত এই উপাচার্যের আমলে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হবে বলে প্রত্যাশা করছেন আন্দোলনপন্থি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল আমার দেশ-এর মাল্টিমিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের গোপন বৈঠকের প্রায় দেড় ঘণ্টার একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়। শেখ হাসিনার পতনের ঠিক একদিন আগে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অন্তত ১৩ জন শিক্ষক সরকার টিকিয়ে রাখার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

অভিযুক্ত শিক্ষকদের অধিকাংশ ২০২৩ সালের বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। তৎকালীন শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. আব্দুল বাতেন চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত ওই প্রচার কমিটিতে গোপন বৈঠকে অংশ নেওয়া অধিকাংশ শিক্ষক সদস্য ছিলেন। বর্তমানে ড. আব্দুল বাতেন চৌধুরী কলা ও মানবিক অনুষদের ডিন এবং ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তৎকালীন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. তারেক মাহমুদ আবির বর্তমানে শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য এবং প্রক্টর ড. মো. আব্দুল কাইউম মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত আছেন। এছাড়া ড. ইসরাত জাহান সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও লোকপ্রশাসন বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে বহাল রয়েছেন।

তালিকায় থাকা অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন জামাল উদ্দিন, মোহাম্মদ তানভীর কায়সার, দিল আফরোজ খানম, ড. হেনা রানী বিশ্বাস, ড. মো. শফিউল আলম, মো. আরিফ হোসেন, ড. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সুপ্রভাত হালদার এবং ড. খোরশেদ আলম। এসব শিক্ষক বর্তমানে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির দাবিতেও সক্রিয়। গত ২১ এপ্রিল থেকে দুই দফায় ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের কারণে প্রায় ২৫ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম অচল ছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্য সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম, ছাত্রদলের সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন এবং শিবিরের সভাপতি মনিরুল ইসলাম জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতাকারীদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম বছির জানিয়েছেন যে, বর্তমান প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং তদন্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ড. মেহেদী হাসান সোহাগ জানান, বিষয়টি সিন্ডিকেট সভায় উপস্থাপন করে জুডিশিয়াল তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশীদ নিশ্চিত করেছেন যে, সিন্ডিতেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।