গুগল ম্যাপে এখন দেশের ৩৪ জেলার বায়ুর মান, যেভাবে দেখবেন তথ্য

গুগল ম্যাপের মাধ্যমে এখন খুব সহজেই বাংলাদেশের ৩৪টি জেলার বায়ুর মানসংক্রান্ত তথ্য সরাসরি জানা যাচ্ছে। মানচিত্রের ‘এয়ার কোয়ালিটি’ স্তরটি সচল করে যেকোনো নির্দিষ্ট স্থানের ওপর চাপ দিলে সেখানকার বায়ুমান সূচক বা একিউআই প্রদর্শন করছে গুগল। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) বাংলাদেশ থেকে এই উদ্যোগে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের বসানো বায়ুমান পর্যবেক্ষণযন্ত্র থেকে সংগৃহীত তথ্য সরাসরি গুগলের সিস্টেমে যুক্ত হচ্ছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নির্মল বায়ু দিবস উপলক্ষে ক্যাপস বায়ুদূষণের তথ্য জানার এই সহজ পদ্ধতির কথা প্রকাশ করে। বায়ুর মান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোই এই যৌথ উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় রাজধানী ঢাকা প্রায়ই ওপরের দিকে থাকে। সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে, বিশেষ করে অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত কম বৃষ্টির কারণে ঢাকায় বায়ুদূষণ চরম আকার ধারণ করে। তবে বর্তমানে শুধু ঢাকা নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি শহরেই কম-বেশি বায়ুদূষণ ঘটছে এবং তা এখন আর কেবল শুষ্ক মৌসুমেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং প্রায় সারা বছরই চলছে। উদাহরণস্বরূপ, গত এক মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৯টায় বিশ্বের ১২৭টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ষষ্ঠ এবং বায়ুর মান ছিল ১৫৭, যা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। সাধারণত বর্ষা-পরবর্তী শরতের এই সময়ে বায়ুর মান ভালো থাকার কথা থাকলেও এখন আর তা দেখা যাচ্ছে না।

মুঠোফোনে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে বায়ুর মান দেখতে হলে প্রথমে অ্যাপটি খুলে ‘লেয়ারস’ বা স্তরচিহ্নে চাপ দিতে হবে। এরপর সেখান থেকে ‘এয়ার কোয়ালিটি’ অপশনটি নির্বাচন করলে মানচিত্রের বিভিন্ন স্থান নির্দিষ্ট রং ও সংখ্যার মাধ্যমে চিহ্নিত হবে। নির্দিষ্ট কোনো এলাকার ওপর চাপ দিলে সেখানকার বায়ুর মান কেমন, তা বিস্তারিত দেখা যাবে। বায়ুমান সূচক বা একিউআই মূলত বাতাসে থাকা বিভিন্ন দূষকের মাত্রাকে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার মাধ্যমে প্রকাশ করে। এই সংখ্যা ও রং দেখে সংশ্লিষ্ট এলাকার বায়ু ভালো, মাঝারি, অস্বাস্থ্যকর নাকি ঝুঁকিপূর্ণ—সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

ক্যাপস জানিয়েছে, দেশের বায়ুর মান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের জন্য তারা দেশজুড়ে একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ বা ৩৪টি জেলায় তাদের লাইভ মনিটরিং স্টেশন চালু রয়েছে। জেলাগুলো হলো—ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, বরগুনা ও ঝালকাঠি। পর্যায়ক্রমে বাকি জেলাগুলোতেও স্টেশন বসিয়ে দেশের সবকটি জেলাকে এই নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

এই পর্যবেক্ষণযন্ত্রগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর রয়েছে, যা দিয়ে তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা, অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম২.৫, বস্তুকণা পিএম১০, মোট উদ্বায়ী জৈব যৌগ বা টিভিওসি, বায়ুমান সূচক এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। কোনো কোনো জেলার যন্ত্রে সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড পরিমাপের সুবিধাও রয়েছে। ক্যাপসের তথ্য অনুযায়ী, এই স্টেশনগুলো সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টাই সচল থাকে এবং প্রতি ৫ মিনিট পরপর তথ্য পাঠায়। তবে গুগল বিভিন্ন উৎসের তথ্য বিশ্লেষণ ও সমন্বয় করে সাধারণত ঘণ্টাভিত্তিক বায়ুমান সূচক হিসাব করে প্রদর্শন করে থাকে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কলেজের প্রাঙ্গণে এই স্টেশনগুলো স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে বায়ুদূষণ নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছে ক্যাপস।

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর কতটা মারাত্মক প্রভাব পড়ছে, তার একটি চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (ক্রিয়া) এক গবেষণায়। ‘বাংলাদেশে সূক্ষ্ম কণাদূষণের জনস্বাস্থ্য প্রভাব’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনটি ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। ড্যানিয়েল নেসান, হুবার্ট থিয়েরিও ও জেমি কেলির পরিচালনায় এই গবেষণা প্রতিবেদনটির সম্পাদনা করেন জোনাথন সাইডম্যান। গবেষণায় দেখা গেছে, পিএম২.৫ দূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের অকালমৃত্যু ঘটে। এসব মৃত্যুর বড় অংশই স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ফুসফুসের ক্যানসার এবং নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে শুধু নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণেই বছরে প্রায় ৫ হাজার ২৫৮ জন মারা যায়। বাতাসে ভাসমান ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে ছোট অতিক্ষুদ্র কণা (পিএম২.৫) শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে সরাসরি রক্তপ্রবাহেও মিশে যেতে পারে।

ক্রিয়ার হিসাব অনুযায়ী, পিএম২.৫ দূষণের কারণে বাংলাদেশে হাঁপানিতে আক্রান্ত রোগীদের বছরে প্রায় ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮২ বার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হয়। এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ২৬ কোটি ৩০ লাখ কর্মদিবস নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া সূক্ষ্ম কণাদূষণের কারণে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৪৮৫টি শিশু সময়ের আগে জন্ম নেয় এবং ৬ লাখ ৯৬ হাজার ৩৮৯টি কম ওজনের শিশুর জন্ম হচ্ছে। গবেষকদের মতে, বায়ুদূষণের এই ক্ষতিকর প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক (যিনি বর্তমানে অবসরোত্তর ছুটিতে আছেন) ক্যাপসের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, গুগল ম্যাপের মাধ্যমে বায়ুদূষণের তথ্য অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, যা জনসচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করবে। তবে তিনি পর্যবেক্ষণযন্ত্রের মান ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘তুলনামূলক কম দামের যেসব যন্ত্র দিয়ে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, সেগুলোর মান কেমন তা পরীক্ষা করা জরুরি। সাধারণত এসব যন্ত্র তিন থেকে চার বছর পর পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। তাই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ক্যালিব্রেশন ও যন্ত্র বদলানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, পরিবেশ অধিদপ্তরও দেশের বিভিন্ন স্থানে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করে থাকে, তাই মাঝেমধ্যে উভয় প্রতিষ্ঠানের সংগৃহীত তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত যাতে ক্যাপসের যন্ত্রের পাঠের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা যায়।

গুগলের তথ্য মতে, মানচিত্রে প্রদর্শিত বায়ুর মান কেবল একটি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের সরাসরি পাঠানো তথ্যের ওপর নির্ভর করে না। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ স্টেশন ও বাণিজ্যিক সেন্সরের তথ্যের পাশাপাশি স্যাটেলাইটের উপাত্ত, আবহাওয়ার ধরন, যানবাহনের চাপ, অগ্নিকাণ্ড এবং ভূমির আচ্ছাদনসংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় করে চূড়ান্ত বায়ুর মান নির্ধারণ করা হয়। ফলে গুগল ম্যাপের বায়ুমান সূচক এবং কাছাকাছি থাকা কোনো স্টেশনের সরাসরি প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে। তাছাড়া একটি স্টেশনের তথ্য দিয়ে পুরো জেলার সব এলাকার বায়ুর মান একই রকম বলে ধরে নেওয়া যায় না, কারণ অল্প দূরত্বের ব্যবধানেও বায়ুর মান পরিবর্তিত হতে পারে।

ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সাতটি ধাপ অনুসরণ করা প্রয়োজন। এগুলো হলো—বায়ুদূষণের বর্তমান ও ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ, সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ, দূষণের উৎস চিহ্নিত করা, দূষণ বাড়া বা কমার কারণ অনুসন্ধান, নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য পদ্ধতি নির্ধারণ, সময় ও ব্যয়ের ভিত্তিতে পদ্ধতিগুলোর তুলনামূলক ছক তৈরি এবং নির্বাচিত পদ্ধতি প্রয়োগের পাশাপাশি আইনের বাস্তবায়ন করা। তিনি আরও বলেন, ‘দূষণের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য না থাকলে এই কাজগুলোর কোনোটিই সফলভাবে করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের জেলা শহরগুলোতে বায়ুর মান সম্পর্কে পর্যাপ্ত তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে দূষণের উৎস ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।’

অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, ভূমিতে থাকা পর্যবেক্ষণ স্টেশন থেকে পাওয়া তথ্য স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও অন্যান্য উপাত্তের সঙ্গে সমন্বয় করে গুগল মানচিত্রে যুক্ত করছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য তথ্য উন্মুক্ত করতে বড় ভূমিকা রাখছে। ক্যাপস ইতোমধ্যে কয়েকটি সরকারি, বেসরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এই পর্যবেক্ষণযন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা থিসিস ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাবেন। দেশের সব জেলায় নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণ স্টেশন স্থাপন করা গেলে বায়ুদূষণের স্থান ও সময়ভিত্তিক পরিবর্তন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে, যা নীতিনির্ধারণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।