মিয়ানমারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দেশটিতে চলমান সংঘাতের মধ্যে গণহত্যায় নিহতদের হাড়গোড় ও খুলি পরিষ্কার করতে শিশুদের বাধ্য করার মতো লোমহর্ষক ঘটনাও ঘটছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) একটি নতুন প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। গত মঙ্গলবার ওএইচসিএইচআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়।
২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত সময়কালের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে মিয়ানমারে অব্যাহত সহিংসতা এবং সংঘাতভিত্তিক অর্থনীতি একত্রিত হয়ে বেসামরিক জনগণের জীবনে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও নিজেদের বৈধতা অর্জনে সামরিক বাহিনীর মরিয়া চেষ্টা বেসামরিক জনগণের মানবিক সংকট ও জীবনযাত্রার ঝুঁকিকে আরও গভীর করেছে। সামরিক বাহিনী ভয় ও নিয়ন্ত্রণের যে কৌশল প্রয়োগ করছে, তা নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে গ্রাস করেছে।
বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অনবরত বিমান হামলা, অগ্নিসংযোগ, উচ্ছেদ এবং মানবিক সহায়তা প্রদানে বাধা দেওয়ার মতো সহিংস কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ২০১৭ সালের ভয়াবহ সহিংসতার ৯ বছর পরও মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’—উভয় পক্ষের হাতেই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পরিকল্পিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিবরণ এই প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
প্রতিবেদনে উত্তর রাখাইনজুড়ে আরাকান আর্মির চালানো বিভিন্ন অপরাধের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, গুম, জোরপূর্বক শ্রম ও নিয়োগ, বেআইনিভাবে জমি ও আবাসিক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং বিভিন্ন গ্রামসহ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে রোহিঙ্গারা নতুন করে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হচ্ছে।
ওএইচসিএইচআরের প্রতিবেদনে শিশুদের পরিকল্পিতভাবে শ্রমে ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ছয় বছরের ছোট শিশুরাও জঙ্গল পরিষ্কার করা, ভবন নির্মাণ এবং রাখাইন পরিবারগুলোর গৃহস্থালি কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এমনকি একটি ঘটনায় এক শিশুকে গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের হাড় ও মাথার খুলি পরিষ্কার করার কাজে বাধ্য করার তথ্যও উঠে এসেছে।
সশস্ত্র বাহিনীতে জোরপূর্বক নিয়োগ এড়ানোর চেষ্টা করায় রোহিঙ্গাদের গ্রেপ্তার ও আটক করা হচ্ছে বলে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এই জোরপূর্বক নিয়োগের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে অনেক রোহিঙ্গা পরিবার অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বাল্যবিবাহ দিচ্ছে। আটককৃত ব্যক্তিরা মুক্তি পাওয়ার পর জানিয়েছেন, বন্দিশালায় তাঁদের ওপর নিয়মিত অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো। নির্যাতনের মধ্যে ছিল বাঁশের লাঠি, রাবারের পাইপ ও বেল্ট দিয়ে পেটানো, দেশলাই ও সিগারেট দিয়ে শরীর পুড়িয়ে দেওয়া, পা ওপরের দিকে ঝুলিয়ে ঘুরিয়ে অজ্ঞান করে ফেলা, যৌনাঙ্গে মরিচ দেওয়া এবং হাতের নখ উপড়ে ফেলার মতো বর্বরতা।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমারজুড়ে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি অবৈধ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ করে দিয়েছে, যা মূলত সংঘাতের অর্থায়ন করছে। খনিজ সম্পদের অবৈধ উত্তোলন, মাদক উৎপাদন, মানব পাচার এবং অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারের বিস্তারের কারণে এই মানবাধিকার সংকট অব্যাহত রয়েছে। এই অর্থনৈতিক ধস ও সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতি এমন এক শ্রমবাজার তৈরি করেছে, যা অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর জন্য শোষণ করা সহজ করে তুলেছে। প্রাকৃতিক সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিবেশ, জীবিকা এবং প্রথাগত ব্যবস্থাগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
কাচিন ও শান রাজ্যে অবৈধ অর্থনীতি ও বিরল খনিজের (রেয়ার আর্থ) খনিকে কেন্দ্র করে আন্তসীমান্ত অপরাধী নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটেছে। উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, কাচিনে ২০২১ সালের পর নতুন ৩০২টি খনি সাইট তৈরি হয়েছে, যা আগের চেয়ে ১৪৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে শান রাজ্যে সেনা অভ্যুত্থানের আগে খনি সাইট ছিল মাত্র ১২টি, যা পরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫টিতে। প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যপ্রাপ্তি সীমিত হলেও প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে এই অবৈধ বাণিজ্যপ্রবাহ সর্বোচ্চ ১৪০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল।
জোরপূর্বক সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে খনি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সুপারভাইজার, নিরাপত্তাকর্মী ও মিলিশিয়া সদস্যদের দ্বারা নারীদের যৌন সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক এই প্রতিবেদনের বিষয়ে বলেন, প্রতিবেদনে বহু স্তরে এবং দেশজুড়ে থাকা দুর্ভোগ, দুর্দশা ও নির্মমতার এমন এক চিত্র উঠে এসেছে, যা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তিনি সব রাষ্ট্র, কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন মিয়ানমারে তাদের কর্মকাণ্ড বা নিষ্ক্রিয়তার বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আত্মপর্যালোচনা করে এবং নিজেদের সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার বিষয়টি খতিয়ে দেখে।

