বাসায়ও বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারেন না দিলারা জামান

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন অভিনয়ের জগতে দিলারা জামান। সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে, শরীরও আগের মতো সঙ্গ দেয় না। তবু অভিনয়ের প্রতি তার দায়বদ্ধতা কিংবা ভালো কাজ করার আকাঙ্ক্ষায় ভাটা পড়েনি। বরং চরিত্রকে কেবল মুখস্থ করে পর্দায় তুলে ধরার বদলে নিজের অনুভূতি ও অস্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে নেওয়াকেই শিল্পীর আসল কাজ বলে মনে করেন এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। সম্প্রতি একটি শুটিংয়ে অভিনয় ও ব্যক্তিজীবনের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন দিলারা জামান। সেখানে তিনি জানান, একজন শিল্পীকে চরিত্রের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। শুধু সংলাপ বলা বা নির্দেশনা অনুযায়ী অভিনয় করলেই পূর্ণাঙ্গ শিল্পী হয়ে ওঠা যায় না। চরিত্রের অনুভূতিকে নিজের মধ্যে ধারণ করার মধ্য দিয়েই অভিনয় সত্যিকারের অর্থ পায়। দিলারা জামান বলেন, ‘শিল্পী কিন্তু শিল্পী হতে পারে না, যতক্ষণ না তার ভেতর থেকে সব কিছুকে সে নিজের ভেতরে ধারণ করতে না পারে। প্রত্যেকটি চরিত্র বা কোনো সংলাপকে নিজের ভেতরে ধারণ করতে হয়।’

অভিনয়ের এই দর্শনের সঙ্গে নিজের জীবনকেও যেন মিলিয়ে দেখেন তিনি। জীবনের অন্যতম স্বপ্ন হিসেবে একটি নিজের ঘর বা জায়গার আকাঙ্ক্ষার কথা জানান এই অভিনেত্রী। ঢাকায় নিজের কোনো জমি না থাকলেও অনেক কষ্ট করে একটি ছোট বাসা কিনেছেন তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে সেই বাসার চারপাশের চিত্র বদলে গেছে। একসময় যেখানে খোলা জায়গা ও আলো-বাতাস ছিল, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে একের পর এক বহুতল ভবন। ফলে নিজের বাসাতেও পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পাওয়ার সুযোগ কমে গেছে তার। আর সে কারণেই শুটিংয়ের প্রয়োজনে যখন খোলা প্রকৃতির মধ্যে যাওয়ার সুযোগ পান, তখন সেটিকে আলাদা আনন্দ হিসেবে দেখেন তিনি। দিলারা জামান বলেন, ‘আমি যখন শুটিংয়ে এরকম খোলা পরিবেশের মধ্যে, প্রকৃতির মাঝে আসি, তখন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারি না। বসে থাকি বাইরে। সবাই বলে ঘরে যান, ঘরে যান। আমি বলি, আমাকে একটু বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে দাও।’

বয়সের কারণে নিয়মিত কাজ করার সুযোগ এখন আগের তুলনায় সীমিত। শারীরিক সামর্থ্যও সবসময় অনুমতি দেয় না। কিন্তু একজন শিল্পীর ভেতরের যে সৃষ্টির ক্ষুধা, সেটি এখনো প্রবল। ভালো একটি কাজের মাধ্যমে দর্শকের মনে দীর্ঘদিন থেকে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে এখনো রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকটা শিল্পীর মনটা দুর্ভিক্ষের মানুষের মতো হাহাকার করে, আকুতি জানায় যে একটা ভালো কাজ করব। আমারও সেই অবস্থা হয়েছে। এখন শরীর সায় দেয় না। তারপরও মনে করি, একটা ভালো কাজ করতে পারি, তাহলেও দর্শকের কাছাকাছি, মনের মধ্যে অনেকদিন আমি বেঁচে থাকব।’

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অভিনয়ের প্রতি নিজের সততাকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন দিলারা জামান। কাজের ক্ষেত্রে পরিচালকের সন্তুষ্টিকেই নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি। চরিত্র বা দৃশ্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে যতবার প্রয়োজন, ততবার কাজ করতে আপত্তি নেই তার। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে এই অভিনেত্রী বলেন, ‘আমি যেটুকু কাজ করি, আমি সততার সঙ্গে করি, আমি কাউকে কষ্ট দিই না। আমার ডিরেক্টর যতক্ষণ না সন্তুষ্ট হবেন, যতবার বলবেন আমি কাজ করব। সেখানে আমার কোনো কমপ্রোমাইজ নেই।’

শিল্পীজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দিলারা জামানের উপলব্ধি, যেকোনো পেশায় সাফল্যের জন্য সততা, শ্রম ও চেষ্টা অপরিহার্য। সামান্য প্রশংসা কিংবা পরিচিতি পেলেই নিজেকে বড় মনে করার প্রবণতা একজন শিল্পীর পথচলায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই শেখার প্রক্রিয়াকে কখনো থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়। তার মতে, অভিনয়ে শেখার কোনো শেষ নেই। এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মের কাছ থেকে যেমন শেখে, তেমনি পুরোনো শিল্পীরাও নতুনদের কাজ দেখে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারেন। সময় বদলেছে, বদলেছে কাজের ধরন ও প্রযুক্তি। আর এই পরিবর্তন নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য তৈরি করেছে শেখার আরও বড় সুযোগ। বর্তমান সময়ের অভিনয়শিল্পীদের সৌভাগ্যবান মনে করেন দিলারা জামান। কারণ প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে তারা এখন দেশ-বিদেশের অসংখ্য কাজ দেখতে, বিভিন্ন ধরনের অভিনয় সম্পর্কে জানতে এবং নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারছেন। নতুন প্রজন্মের প্রতি আশাবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন যারা কাজ করে, আমি বলব তারা অনেক ভাগ্যবান। কারণ এই প্রযুক্তির কারণে তারা অনেক কিছু শিখতে পারে, জানতে পারে। আমাদের সময়ে সে সুযোগটা ছিল না। তো তারা ভালো কাজ করবে এই আশা আমি সবসময় করি। আমাদের চেয়ে ভালো কাজ করবে।’

অভিনয়ের দীর্ঘ পথচলায় নিজের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, চরিত্রের প্রতি সততা আর নতুন কিছু শেখার আকাঙ্ক্ষাকেই সঙ্গী করেছেন দিলারা জামান। শরীর হয়তো আগের মতো সাড়া দেয় না, কিন্তু শিল্পীসত্তার সেই তাড়না এখনো অটুট। তাই বয়সের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একটি ভালো কাজের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি- যে কাজ তাকে আবারও দর্শকের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে।