যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত অবসানের সম্ভাবনা আবারও সুদূরপরাহত হয়ে পড়েছে। বিবদমান দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন ধাপে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে ইরান এবং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করা এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা বন্ধ করা। গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন সপ্তম মাসে গড়িয়েছে। গত জুনে দুই পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল ৬০ দিনের মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও চুক্তিতে পৌঁছানো। তবে সেই সময়সীমা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নিতে পারে, তা নিয়ে বিবিসি তিনজন বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসির মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য কী, তা এখনো স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। হোয়াইট হাউস রাজনৈতিক দিক থেকে কতটুকু ছাড় দেওয়া সম্ভব, তা বারবার পর্যালোচনা করছে। শুরুতে সামরিক শক্তি দিয়ে দ্রুত জয় পাওয়ার আশা থাকলেও বাস্তবে সেই প্রত্যাশিত ফল আসেনি। বর্তমানে ওয়াশিংটন সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে চাপ তৈরির চেষ্টা করছে এবং পরিস্থিতি স্থবির রাখতেই আগ্রহী। মার্কিন প্রশাসন অর্থনৈতিক অবরোধ বহাল রাখার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টির মতো ইরানি সক্ষমতাগুলোতে মাঝেমধ্যে আক্রমণ চালিয়েই সন্তুষ্ট থাকছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশা, নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান দুর্বল হয়ে পড়বে এবং একপর্যায়ে নতি স্বীকার করে আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে। তবে ক্যাম্পবেলের ধারণা, সংকট সমাধানের বিনিময়ে ইরান বড় ধরনের সুবিধা দাবি করবে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের অ্যাসোসিয়েট ফেলো আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি মনে করেন, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার ফলে যুদ্ধের ব্যাপারে ইরানের মূল কৌশলে কোনো পরিবর্তন আসবে না। তেহরান তাদের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং বড় ধরনের যুদ্ধ এড়াতে প্রতিটি হামলার আনুপাতিক জবাব দেওয়ার কৌশল বজায় রাখছে। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা স্পষ্টত দেশটির অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং কাঠামোগত দুর্বলতাও রয়েছে, যা গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারির বিক্ষোভে দেখা গেছে। তবে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ইরান শিগগিরই তাদের অবস্থান বদলাবে কিংবা আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করবে—এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। তেহরান চায় যুক্তরাষ্ট্র আগের সমঝোতা স্মারকে ফিরে আসুক অথবা কোনো ধরনের ছাড় দিক। নতুন নিষেধাজ্ঞা বা আরও হামলার মুখেও তারা নিজেদের নীতি বদলাবে না।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ইরানে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিকোলাস হপটন বলেন, সাম্প্রতিক হামলা বাড়িয়েও ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না। অর্থনৈতিক চাপ কাজ করবে না, কারণ চীন ও রাশিয়াসহ যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করবে না। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা অব্যাহত রাখতে পারে, কারণ তারা বিশ্ব অর্থনীতির মূল নাড়ি চেপে ধরে আছে। হপটনের মতে, ট্রাম্প যদি গত জুনের সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে আলোচনার জন্য আন্তরিক উদ্যোগ নিতেন, তবে সেটিই হতো সংঘাত থেকে বের হওয়ার মোক্ষম উপায়। এই চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় অর্জিত হতো, ইরানের কট্টরপন্থীরা দুর্বল হতো এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার নিশ্চয়তা মিলত। নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে ধীরে ধীরে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ক্ষমতা কমত এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতো। তবে বর্তমানে সেই কৌশলগত ধৈর্যের বড়ই অভাব রয়েছে, ফলে পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল ও অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে, যা সবার জন্যই ক্ষতিকর।

