ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও মাদ্রাসাছাত্রদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের লাঠিচার্জ এবং ছাত্রদের হামলায় উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাতের এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর ছাত্রদের ৫ দফা দাবি মেনে নিয়েছে জেলা পুলিশ। একই সঙ্গে তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী সস্ত্রীক ব্রাহ্মণবাড়িয়া সফরে আসেন। তাঁর স্ত্রী তথা পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) উপদেষ্টা সিদরাতুল মুনতাহার আগমন উপলক্ষে মঙ্গলবার রাতে পুলিশ লাইন্সের ড্রিল শেডে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জাসাসের সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উচ্চস্বরে গান-বাজনা চলছিল। তবে অনুষ্ঠান চলার মাঝেই ডিআইজি সেখান থেকে চলে যান বলে এক পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে উচ্চ শব্দে গান-বাজনা হওয়ায় পাশের দারুল আরকাম মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে শব্দের মাত্রা কমাতে অনুরোধ করেন। পরের দিন বুধবার মাদ্রাসায় পরীক্ষা থাকায় শিক্ষার্থীরা এই অনুরোধ জানান। প্রথমে শব্দ কমানো হলেও পরে আবারও তা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এ নিয়ে পুলিশ ও ছাত্রদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে শতাধিক মাদ্রাসাছাত্র পুলিশ লাইন্সের ভেতরে ঢুকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা চালায় এবং চেয়ার ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে পুলিশ সদস্য ও মাদ্রাসাছাত্রসহ ৩০-৩৫ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ৩১ জন ছাত্র জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সংঘর্ষের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা আরও বাড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রাত ২টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ এবং দুই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দারুল আরকাম মাদ্রাসায় যান। সেখানে তাঁরা মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানসহ শিক্ষকদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে বসেন। বৈঠকে জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে কাওমি ছাত্রঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে ৫ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হামলায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তি, আহতদের সুচিকিৎসা, পুলিশ লাইন্সে আর কখনো কনসার্ট না করার অঙ্গীকার এবং পুরো ঘটনার জন্য পুলিশ সুপারের ক্ষমা প্রার্থনা। ভোর ৪টা পর্যন্ত চলা এই বৈঠকে পুলিশ প্রশাসন ছাত্রদের সব দাবি মেনে নিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
দারুল আরকাম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা সাজিদুর রহমান ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক বলে অভিহিত করেন এবং জানান যে পুলিশ সুপার ছাত্রদের সব দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। জেলা পরিষদ প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম জানান, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ঘটনার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা হবে। বৈঠকে পুলিশ সুপার শাহ মোহাম্মদ আব্দুর রউফ ঘটনাটিকে অনভিপ্রেত ও ভুল বোঝাবুঝি উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
এদিকে ঘটনার পর থেকে জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের ফোন ধরেননি এবং তাদের কার্যালয়েও পাওয়া যায়নি। অবশেষে বুধবার বিকেলে জেলা পুলিশের মিডিয়া সেল থেকে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটি নামবিহীন প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, পুলিশ লাইন্সের গেট ও কম্পাউন্ড ডিউটিতে অবহেলার অভিযোগে তিনজন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ)-কে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

