কেন কিছু নারী সাধারণের চেয়ে বেশি রং দেখতে পান?

চারুকলা শিল্পী কনসেত্তা আন্তিকো যখন প্রথম বুঝতে পারেন যে, তার ছাত্রছাত্রীরা সাধারণ ছায়ার মধ্যে কোনো বিশেষ রং দেখতে পাচ্ছে না, তখন তিনি বেশ অবাক হয়েছিলেন। তিনি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ বিষয়গুলোতেও নানা রঙের ছটা দেখতে পান, যা অন্যদের কাছে কেবল একটি সাধারণ ছায়া মাত্র। শুরুতে তার ধারণা ছিল, পৃথিবীটাকে সবাই তার মতোই দেখে। কিন্তু পরে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি বুঝতে পারেন, তার দৃষ্টিশক্তি অন্যদের থেকে আলাদা। মিজ. আন্তিকো জানান, তার এক ছাত্র তাকে বলেছিল যে তারা ভেবেছিল তিনি হয়তো শৈল্পিক কোনো কাজ করছেন বলেই এমনটা বলছেন।

পরবর্তীতে জিনগত পরীক্ষায় জানা যায় যে, মিজ. আন্তিকোর শরীরে টেট্রাক্রোম্যাসি নামক এক ধরণের বাড়তি দৃষ্টিশক্তির জৈবিক সম্ভাবনা রয়েছে। বেশিরভাগ মানুষের চোখে তিন ধরণের বিশেষ কোষ থাকে, যাদের বলা হয় 'কোণ'। এই কোণগুলো লাল, সবুজ ও নীল রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য শনাক্ত করে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়, যার মাধ্যমে আমরা রং দেখি। তবে কিছু মানুষের চোখে এই তিনটির বাইরে চতুর্থ আরেকটি কোণ কোষ থাকতে পারে। তত্ত্ব অনুযায়ী, এর ফলে তাদের মস্তিষ্ক অনেক বেশি সংকেত পায় এবং তারা পৃথিবীটাকে আরও বেশি বর্ণিল ও রঙিন হিসেবে দেখতে পান।

বিজ্ঞানীদের মতে, টেট্রাক্রোম্যাটিক হওয়ার সম্ভাবনা মূলত নারীদের মধ্যেই বেশি থাকে। লাল ও সবুজ রঙের সংবেদনশীল কোষগুলোর জিন 'এক্স' ক্রোমোজোমে থাকে। যেহেতু নারীদের দুটি এক্স ক্রোমোজোম থাকে এবং পুরুষদের একটি, তাই জৈবিকভাবে নারীরাই এই বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই জিনের ভিন্নতা অনেক সময় বর্ণান্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাজ্যের নিউকাসল ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ১২ শতাংশ নারীর এই বিশেষ জিনগত ক্ষমতা থাকতে পারে। তবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই শতাংশের হারের তফাৎ হতে পারে।

তবে কেবল অতিরিক্ত কোণ কোষ থাকলেই যে রং দেখার ক্ষমতা বেড়ে যাবে, তা নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউসি আরভাইন ব্রানসন সেন্টারের ড. কিম্বার্লি এ. জেমসন একে 'ফাংশনাল টেট্রাক্রোম্যাসি' হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা প্রমাণ করা বেশ কঠিন। যদিও জিনের কারণে বাড়তি রং দেখার সম্ভাবনা থাকে, তবুও এটি প্রমাণ করা সহজ নয়। ড. জেমসন এমন নারীদেরও খুঁজে পেয়েছেন যাদের চোখে চার ধরণের কোণ কোষ আছে এবং তারা রঙের বর্ণালীর সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো সাধারণ ট্রাইক্রোম্যাটের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট বুঝতে পারেন। পশু-পাখিদের ক্ষেত্রেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়; যেমন স্ত্রী বানরেরা ট্রাইক্রোম্যাট হওয়ায় তারা পুরুষ ডাইক্রোম্যাটদের চেয়ে লাল ফল দ্রুত খুঁজে পেতে সক্ষম হয়।

এ বিষয়ে দার্শনিক ড. মাইকেল নেওয়াল ও স্নায়ুতন্ত্র বিশেষজ্ঞ ড. জেনি বোস্টেনের মতো গবেষকরা বিভিন্ন মত দিয়েছেন। কেউ মনে করেন, টেট্রাক্রোম্যাটরা এমন রং দেখতে পান যা বর্ণনা করা অসম্ভব, আবার কেউ মনে করেন তারা সাধারণ রঙের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো অনেক ভালো বোঝেন। এছাড়া, অতিরিক্ত আলো বা ফ্লুরোসেন্ট টিউব সহ্য করতে না পারা টেট্রাক্রোম্যাটিক নারীদের একটি সাধারণ লক্ষণ হতে পারে বলে ড. জেমসন উল্লেখ করেছেন। কনসেত্তা আন্তিকো মনে করেন, নিয়মিত ছবি আঁকা ও রং মেশানোর অনুশীলনের মাধ্যমেই তিনি তার এই বিশেষ দৃষ্টিশক্তির পূর্ণ ব্যবহার শিখতে পেরেছেন। যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনো বৈজ্ঞানিক বিতর্ক রয়েছে, তবুও এটিকে একটি সুন্দর ও অনন্য অভিজ্ঞতা হিসেবেই দেখছেন মিজ. আন্তিকো।