ঈমান ও নিরাপত্তার ছায়ায় সুখী জীবনের পথনির্দেশনা

ইসলাম পৃথিবীতে এসেছে একমাত্র মহান আল্লাহর ইবাদত সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে। এই ইবাদতের ভিত্তি মজবুত করার পাশাপাশি আল্লাহর বান্দাদের ওপর তাঁর অবশ্যকরণীয় অধিকার, রাসুল (সা.)-এর অধিকার এবং মানুষের একে অপরের প্রতি অধিকারগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো একজন মুসলিম প্রকৃত অর্থে আল্লাহর অনুগত বান্দা হয়ে ওঠা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর কেউ আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করলে সে নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহিদ ও সৎকর্মপরায়ণ—যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন—তাদের সঙ্গী হবে। তারা কত উত্তম সঙ্গী!’ (সুরা নিসা: ৬৯)।

উলামায়ে কেরাম বলেছেন, ‘সৎ ব্যক্তি সে-ই, যে আল্লাহর হক ও বান্দাদের হক আদায় করে; ফলে সে নামাজের তাশাহহুদে পাঠ করা এই দোয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়, ‘আমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক এবং আল্লাহর সৎ বান্দাদের উপরও।’ আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে ও কোনো কিছুকে তাঁর শরীক করবে না। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক, অহংকারীকে।’ (সুরা নিসা : ৩৬)। আলেমগণ এটিকে ‘অধিকারগুলোর আয়াত’ বলে অভিহিত করেন। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর।’ (সুরা আহজাব : ৬)। এছাড়া আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মদীনাবাসী ও এদের পার্শ্ববর্তী মরুবাসীদের জন্যে সঙ্গত নয় আল্লাহর রাসুলের সহগামী না হয়ে পিছনে থেকে যাওয়া এবং তার জীবন অপেক্ষা তাদের নিজেদের জীবনকে প্রিয় জ্ঞান করা।’ (সুরা তাওবা : ১২০)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সুরা আনফাল : ০১)।

ইসলাম পৃথিবীতে নিরাপত্তা, শান্তি ও রহমত প্রতিষ্ঠার জন্য এসেছে। এই ধর্ম প্রথমে মুসলিমের নিরাপত্তার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে ও ঈমানের ভিত্তি স্থাপন করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে আর তাদের ঈমানকে জুলুম দিয়ে কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্যে আর তারাই সৎপথপ্রাপ্ত।’ (সুরা আনআম: ৮২)। যে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমান অর্জন করে এবং আল্লাহ তাকে শিরকসহ সব ধরনের জুলুম থেকে রক্ষা করেন, তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে পূর্ণ নিরাপত্তা থাকবে; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন প্রতিশ্রুতি যা কখনো ভঙ্গ হবে না। যার ঈমানে ঘাটতি থাকে এবং সে নিজের বা অন্যের ওপর কোনো জুলুম করে, তার দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা ও সুখ ততটাই কমে যায়, যতটা তার তাওহীদ ও সৎপথে অবিচলতার ঘাটতি থাকে। আল্লাহ আরও বলেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়; যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, পরম আনন্দ ও শুভ পরিণাম তাদেরই।’ (সুরা রাদ : ২৮-২৯)। তিনি আরও বলেন, ‘মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকর্ম করবে তাকে আমি নিশ্চয়ই পবিত্র জীবন দান করব। আর তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।’ (সুরা নাহল : ৯৭)।

যখন আল্লাহ কোনো দেশকে নিরাপত্তা ও শান্তি দান করেন, তখন ধর্ম সেখানে সুস্পষ্ট ও সম্মানিত হয়ে ওঠে; নামাজ, জুমা ও জামাত প্রতিষ্ঠিত হয়; মানুষের কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কল্যাণগুলো সুশৃঙ্খল হয়; মানুষ তাদের জীবন, সম্মান ও সম্পদের নিরাপত্তা পায়; সভ্যতা উন্নত হয়; পথঘাট নিরাপদ হয়; শহরগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়; রিজিক সহজলভ্য হয়; সমৃদ্ধি ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মন শান্ত হয়। সুতরাং নিরাপত্তার মধ্যেই সব ধরনের কল্যাণ একত্রিত থাকে। আর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সব ধরনের অকল্যাণ একত্রিত হয়। নিরাপত্তা ইসলামের পূর্ণতার একটি অংশ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ অবশ্যই এই ইসলামের পূর্ণতা দান করবেন, এমনকি একজন আরোহী সানআ থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত ভ্রমণ করবে। সে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না, আর তার পশুর ওপর নেকড়ে ছাড়া অন্য কিছুরও নয়।’ (বোখারি: ৩৬১২)।

মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় ইসলামের প্রথম যুগেই নিরাপত্তা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বাস্তবায়িত হয়েছিল। তিনি আদী ইবন হাতিম (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘যদি তুমি দীর্ঘ জীবন পাও, তবে অবশ্যই দেখবে যে, একজন নারী হিরা থেকে রওনা হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করবে, সে আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবে না।’ আদি বলেন, ‘আমি সেই নারীকে দেখেছি যে, সে হিরা থেকে রওনা হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করেছে, অথচ আল্লাহ ছাড়া সে কাউকে ভয় করেনি।’ (বোখারি : ৩৫৯৫)। এটি সেই সার্বিক নিরাপত্তার উদাহরণ যা মানবজাতি উপভোগ করেছিল। বিশ্বনবী (সা.) নতুন চাঁদ দেখলে বলতেন, ‘হে আল্লাহ! এই চাঁদকে আমাদের ওপর উদিত করুন নিরাপত্তা, ঈমান, সুস্থতা ও ইসলামের সঙ্গে। এটি কল্যাণ ও সঠিক পথের চাঁদ।’ (তিরমিজি)।

ইসলামের ইবাদতগুলো নিরাপত্তা ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হয় না। নামাজ, জাকাত ও হজ পূর্ণ নিরাপত্তার মধ্যেই আদায় করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হবে… যদি তোমরা আশঙ্কা কর তবে পদচারী বা আরোহী অবস্থায় সালাত আদায় করবে। আর যখন তোমরা নিরাপদ বোধ কর তখন আল্লাহকে স্মরণ করবে।’ (সুরা বাকারা : ২৩৮-২৩৯)। হজ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্জের প্রাক্কালে উমরা দিয়ে লাভবান হতে চায় সে সহজলভ্য কুরবানী করবে।’ (সুরা বাকারা : ১৯৬)। পবিত্র কাবাঘর সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্যে সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা তো বাক্কায়… যে কেউ সেখানে প্রবেশ করে সে নিরাপদ।’ (সুরা আলে ইমরান : ৯৬-৯৭)। ইবরাহিম (আ.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! এই নগরীকে নিরাপদ কর।’ (সুরা ইবরাহিম : ৩৫)। আল্লাহ উমরাহ পালনকারীদের নিরাপত্তার অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘তোমরা অবশ্যই মসজিদুল-হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে।’ (সুরা ফাতহ : ২৭)। জান্নাতও নিরাপত্তা ছাড়া আনন্দদায়ক নয়, সেখানেও বলা হবে, ‘তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে এতে প্রবেশ কর।’ (সুরা হিজর : ৪৬)।

নিরাপত্তা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায়কে অপরিহার্য করে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদেরকে অবশ্যই অধিক দেব আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম : ০৭)। তোমরা এমন কিছু মহৎ দিন ও বরকতময় সময়ের সম্মুখীন হচ্ছ; সুতরাং এগুলোকে সৎকর্ম দ্বারা পূর্ণ করো। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের ভবিষ্যতের জন্যে কিছু কর এবং আল্লাহকেও ভয় কর।’ (সুরা বাকারা : ২২৩)। হে আদম সন্তান! যতক্ষণ তুমি সুস্থ ও ভালো অবস্থায় আছ এবং সৎকর্ম করার সামর্থ্য রাখো, ততক্ষণ আখিরাতের জন্য আমল করো। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামত রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত: স্বাস্থ্য ও অবসর।’ (সুনানে তিরমিজি : ২৩০৪)। বিশ্বনবী (সা.) আরও বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সকালে এমন অবস্থায় জাগে যে, সে নিজ এলাকায় নিরাপদ, শরীরের সুস্থতা ও দিনের খাদ্য তার কাছে আছে, তাহলে যেন পুরো দুনিয়াই তাকে দেওয়া হয়েছে।’ (তিরমিজি : ২৩৪৬)।