অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নাজুক। এই কঠিন বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় গড়ে ওঠা এক বিরল জাতীয় ঐক্য। এই সামাজিক ও রাজনৈতিক পুঁজিই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ভিত্তি হিসেবে এই শক্তিকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে তারা আমলাতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দিকেই বেশি মনোযোগী ছিল। তবে সরকার চাইলে সংসদীয় ও আইনি প্রক্রিয়ায় চুক্তিটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করার সুযোগ নিতে পারে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক গোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সমাজের সম্মিলিত উত্থান। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই রাষ্ট্র মোটেই ছোট নয়। সেই সময়ের মূল প্রত্যাশা ছিল তিনটি—জাতির ঐক্য শক্তিশালী করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা। মানুষ চেয়েছিল একটি জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। দুঃখজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উপদেষ্টা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আমলাতান্ত্রিক চিন্তায় আটকে থাকায় এই বিশাল সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সাফল্যও ছিল। সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ভূ-রাজনীতির অস্থিরতার মধ্যেও বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর তাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে তাদের সীমাবদ্ধতা ছিল স্পষ্ট। জাতীয় ঐক্য দৃঢ় করার বদলে রাষ্ট্র পরিচালনায় অতিরিক্ত আমলানির্ভরতা এবং জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশীদার করতে ব্যর্থ হওয়া তাদের অন্যতম দুর্বলতা ছিল। এছাড়া তরুণদের ক্ষমতায়নের বদলে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেওয়া এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বর্তমানে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব পালন করছে। তাদের শাসনকালের কয়েক মাস পেরিয়েছে, তাই এখনই চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় আসেনি। সংসদ প্রতিষ্ঠিত হওয়া, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সচলতা এবং অর্থনীতিকে প্রবৃদ্ধির পথে ফেরানোর উদ্যোগ ইতিবাচক লক্ষণ। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমেছে ২-এর ঘরে। জুলাইয়ের মূল প্রত্যাশা পূরণের সমার্থক এগুলো নয়। প্রকৃত পরিবর্তনের পরীক্ষা হবে নিয়োগ ও পদায়নের মানের ওপর। ‘আমাদের লোক’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে বসাতে না পারলে পরিবর্তনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য সংকোচন এবং নতুন প্রবৃদ্ধির চালক তৈরির মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষাকে আবার সমাজের কেন্দ্রীয় মূল্যবোধে পরিণত করা জরুরি। জুলাইয়ের মূল্যায়নে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের পরিবর্তন কতটা হলো, তা-ই ইতিহাসে বড় হয়ে উঠবে। সবশেষে, জুলাইয়ের সেই জাতীয় ঐক্য, ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ার আকাঙ্ক্ষাটি ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজসহ প্রতে৵ক নাগরিকের।

