ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও জীবন বীমা করপোরেশনের (জেবিসি) মধ্যে বিদ্যমান সমন্বয়হীনতার কারণে মৃত ও অসুস্থ প্রবাসী কর্মীদের ৫৬ কোটি টাকার বীমা দাবি পরিশোধ নিয়ে তীব্র জটিলতা তৈরি হয়েছে। দুই সরকারি প্রতিষ্ঠান একে অপরকে দায়বদ্ধতার কাঠগড়ায় দাঁড়া করালেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভুক্তভোগী প্রবাসীদের পরিবারগুলোর ওপর, যারা এখন দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
কল্যাণ বোর্ডের অভিযোগ, সব প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও জীবন বীমা করপোরেশন সময়মতো অর্থ পরিশোধ করছে না। অন্যদিকে জেবিসির ভাষ্যমতে, কল্যাণ বোর্ডের নতুন এমআইএস সফটওয়্যারের সঙ্গে তাদের সিস্টেমের সমন্বয়হীনতা এই বিলম্বের প্রধান কারণ। এছাড়া জেবিসি দাবি করছে, কল্যাণ বোর্ডের কাছে তাদের প্রিমিয়াম বাবদ ২২ কোটি ৮১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
২০১৮ সালের কল্যাণ বোর্ড আইনের আওতায় প্রবাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক বীমা ব্যবস্থা চালু হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে জেবিসির সঙ্গে প্রথম চুক্তি হয়, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নবায়ন করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সি বিদেশগামী কর্মীদের পাঁচ বছর মেয়াদি পলিসির জন্য এককালীন এক হাজার টাকা প্রিমিয়াম দিতে হয়। কল্যাণ বোর্ড এই প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে জীবন বীমা করপোরেশনকে প্রদান করে। বীমার শর্তানুযায়ী, কোনো কর্মী মারা গেলে তার পরিবার সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা, এছাড়া কর্মক্ষমতা হারালে বা চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরলে নির্দিষ্ট আর্থিক সুবিধা পাওয়ার কথা রয়েছে।
বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৫৭ লাখ ৭৩ হাজার ৬২ জন কর্মী এই বীমার আওতায় এসেছেন এবং বোর্ড জেবিসিকে প্রায় ৪৮৮ কোটি ৫২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৪০ টাকা প্রিমিয়াম বাবদ পরিশোধ করেছে। অথচ এপ্রিল পর্যন্ত দাবিনামা নিষ্পত্তির হার মাত্র ৫৬ দশমিক ১১ শতাংশ।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষার পরও টাকা পাচ্ছেন না। মাদারীপুরের লিটন মিয়া গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবে মারা গেলেও তার পরিবার এখনো বীমার টাকা পায়নি। লিটনের মেয়ে সুমাইয়া জানান, বাবার মৃত্যুর পর বিমানবন্দরে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হলেও বীমার বড় অংকের টাকা পেতে এখনো আশ্বাস ছাড়া কিছুই মিলছে না। এছাড়া কুয়েতে মৃত জামাল মিয়ার পরিবারও প্রায় দেড় বছর পার হতে চললেও ১০ লাখ টাকার বীমা সুবিধা পায়নি।
পরিস্থিতি নিরসনে গত ১ জুলাই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও জেবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের উপস্থিতিতে উচ্চপর্যায়ের একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বীমা দাবি পরিশোধের এই দীর্ঘসূত্রতা সরকারের এই মহৎ উদ্যোগের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। জেবিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কল্যাণ বোর্ডের সাথে আইটি বিভাগগুলো কাজ করছে এবং আশা করা হচ্ছে খুব দ্রুত এই জটিলতা কেটে যাবে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, মৃত প্রবাসীদের পাওনা নিয়ে কালক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই এবং এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।

