১৫ জেলায় ডেঙ্গুর বড় ঝুঁকি, দেশজুড়ে ৩ মাসের পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু

দেশের ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বিগত চার বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে দেশের অন্তত ১৫টি জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এই জেলাগুলো হলো—ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, বরগুনা, বান্দরবান ও পটুয়াখালী।

এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে আজ শনিবার থেকে দেশজুড়ে তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নামছে সরকার। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, জনসম্পৃক্ততা ছাড়া ডেঙ্গু মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সরকারের তিন-চারটি মন্ত্রণালয় যুক্ত থাকবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকেরা এতে অংশ নেবেন। প্রতি শনিবারে এই অভিযান চালানো হবে এবং শিক্ষার্থীরাও নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে অংশ নেবে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদরা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ চরম আকার ধারণ করতে পারে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীও জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে এবং অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ বা 'পিক' সময় আসতে যাচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত ৪৯ হাজার ২২০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৪১ জন। মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ৫ জন, জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, আগস্টে ৪৩ জন এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ১১ দিনেই ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আক্রান্ত ও মৃত্যুর লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে একটি ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি তথ্যমতে, ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের হার বেশি হলেও মৃত্যুর হার নারীদের মধ্যে বেশি। আক্রান্তদের ৬২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারী হলেও, মোট মৃত্যুর ৫২ শতাংশই নারী এবং ৪৮ শতাংশ পুরুষ। ভৌগোলিক দিক থেকে ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে খুলনা বিভাগে। একই সাথে দেশজুড়ে হামের সংক্রমণও চলছে, যাতে এ বছর এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু। ফলে যেসব পরিবারে শিশু রয়েছে, সেখানে ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম নিয়েও উদ্বেগ বিরাজ করছে।

আইইডিসিআর-এর গবেষকেরা ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের তথ্যমতে, এ বছর ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ, যা গতকাল পর্যন্ত সামান্য বেড়ে শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং মারা গিয়েছিলেন ১ হাজার ৭০৫ জন, যেখানে মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৪৯ ও শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ।

ডেঙ্গুর ধরন বা সেরোটাইপ নিয়ে আইইডিসিআর-এর ৭১ জন রোগীর নমুনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ সংক্রমণের জন্য দায়ী ডেঙ্গুর 'ডেনভি-৩' ধরন। বাকি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ সংক্রমণ ঘটছে 'ডেনভি-২' এর কারণে। বিশেষ করে বরগুনা, বান্দরবান ও পিরোজপুর জেলায় ডেনভি-২ ধরনের সংক্রমণ দেখা গেছে। রোগতত্ত্ববিদদের মতে, ডেঙ্গুর চারটি ধরন (ডেনভি-১, ২, ৩ ও ৪) রয়েছে। কোনো ব্যক্তি একবার একটি ধরনে আক্রান্ত হলে তার শরীরে সেই ধরনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়, তবে বাকি তিনটি ধরনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার ভিন্ন ধরনে আক্রান্ত হলে রোগীর শারীরিক জটিলতা ও জীবনহানির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশে গত আড়াই দশক ধরে ডেঙ্গু একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রূপ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানসম্মত উদ্যোগের অভাব এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করতে না পারার কারণেই পরিস্থিতি এমন উদ্বেগজনক হয়েছে। অথচ প্রায় একই ভৌগোলিক ও পরিবেশগত অবস্থানে থাকা ভারতের কলকাতার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয়ের অভাবকেও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ ড. কে কৃষ্ণমূর্তি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ২২ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন, যা বাস্তবায়ন করা হয়নি। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে আরেক জ্যেষ্ঠ কীটতত্ত্ববিদ বি এন নাগপাল এসে ঘরে টেবিল-চেয়ার ও পর্দার পেছনের অন্ধকার স্থানে এডিস মশার বংশবৃদ্ধির বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার পরামর্শ দিলেও তা প্রচারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সরকারের চলমান উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, এই কর্মসূচির সঠিক পরিকল্পনা থাকতে হবে। স্বেচ্ছাসেবক সম্পৃক্তকরণের জন্য রেড ক্রিসেন্টকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে এবং তিন can মাস পর পুরো কার্যক্রমের মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত এই কার্যক্রম সারা বছর ধরে কয়েক বছর অব্যাহত রাখতে হবে এবং জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। একই সাথে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানান যেন বিএনপি সহ দেশের সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের এই জাতীয় কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করা হয়।

কলকাতায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আছে।.গত আড়াই দশকে মশা নিয়ন্ত্রণের বিজ্ঞানসম্মত উদ্যোগ না নেওয়ায়, মানুষকে কার্যকরভাবে সচেতন ও সম্পৃক্ত না করায় এই রোগ স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।.ঢাকায় তথা বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বড় ধরনের প্রকোপ দেখা দেয় ২০০০ সালে।