৫ আগস্ট আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন। এটি বাংলা বদ্বীপের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, গৌরব ও বিজয়ের ধারাবাহিকতার এক অনন্য প্রতীক। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে ঔপনিবেশিক বেনিয়া শাসনের সূচনার পর থেকেই এই ভূখণ্ডের মানুষ মুক্তির জন্য জেগে ওঠে। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, হাজি শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন, হাবিলদার রজব আলীর বিদ্রোহ এবং শেরে বাংলার লাহোর প্রস্তাব সেই দীর্ঘ অভিযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই জাতি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন ভূখণ্ডের অধিকার অর্জন করেছিল।
তবে সেই স্বাধীনতার আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর জনগণ নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। দীর্ঘ চব্বিশ বছরের বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই শেষে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় আমাদের লাল-সবুজের পতাকা। কিন্তু লাখো শহীদের আত্মদান সত্ত্বেও জনগণের প্রত্যাশিত ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতায় বহু স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়।
গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর দীর্ঘদিনের দমনপীড়নের ধারাবাহিকতায় ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনেও হাসিনার লাঠিয়াল বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায়। সেই রক্তস্নাত অধ্যায় থেকেই প্রতিরোধের এক নতুন ইতিহাস জন্ম নেয়। ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষক, আলেম-ওলামা, আইনজীবী, নারী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক, প্রবাসী, সৈনিক ও তরুণ সেনা অফিসারসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির সম্মিলিত সংগ্রামে বাকশালী অপশক্তির পতন ঘটে। চৌদ্দ শত শহীদ এবং ত্রিশ হাজার আহতের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ৫ আগস্ট আসে বহুল প্রতীক্ষিত মুক্তির প্রভাত।
দুঃখজনক হলো, ৫ আগস্টের সেই বিজয়লগ্ন থেকেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রবল অসহযোগিতার কারণে শহীদদের আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবে রূপ পায়নি। ক্ষমতার লিপ্সার কাছে ফ্যাসিবাদী কাঠামো বিলোপের গণআকাঙ্ক্ষা পরাজিত হয়েছে। বিপ্লবের দুই বছর পরও সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরেনি। সরকারের নজিরবিহীন দলীয়করণ, সংস্কারবিরোধী অবস্থান, ক্ষমতার অতিমাত্রায় কেন্দ্রীকরণ এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা জাতিকে আবারো সংকটের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে।
শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিম, শহীদ মুগ্ধ ও শহীদ হৃদয় তরুয়াসহ সকল শহীদের রেখে যাওয়া আমানত আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি। এর মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিক মর্যাদাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার মহান সংগ্রামে সবাইকে সক্রিয়ভাবে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ।

