ধর্মীয় বিষয়ে সরকারের কাছে নিজেদের দাবিদাওয়ার সংখ্যা কমিয়ে এনেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ২০১৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে ১৩ দফা দাবি তুলে ধরে দেশজুড়ে আলোচনায় আসা এই সংগঠনটি এবার বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ৯ দফা দাবি পেশ করেছে। সংগঠনের বর্তমান ও অতীতের দাবিগুলো বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আগের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি হেফাজত নিজে থেকেই ‘আশ্বস্ত’ হয়ে বাদ দিয়েছে, আবার নতুন কিছু দাবি যুক্ত করেছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি সফরে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার যান। এই সফরের নানা কর্মসূচির ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মহিবুল্লাহ Babunagari-র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকেই হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ধর্মীয় বিষয়ে ৯ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে নতুন দাবি হিসেবে এসেছে ‘হেযবুত তওহীদ’ নামের সংগঠনটি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি।
এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক Islamabadী জানান, হেযবুত তওহীদ ইসলাম ধর্মকে বিকৃত করছে এবং সমাজে বিভিন্ন ফিতনা ছড়াচ্ছে। তাদের এসব তৎপরতা দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ হওয়ায় সংগঠনটি নিষিদ্ধের দাবি জানানো হয়েছে। এর আগে হেফাজতের পক্ষ থেকে কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম’ ঘোষণার দাবি সব সময়ই ছিল, যা এবারও বহাল রয়েছে। তবে এবার হেযবুত তওহীদ নিষিদ্ধের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পেশ করা নতুন দাবিগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষায় দাওরায়ে হাদিসকে দেওয়া মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতির কার্যকর বাস্তবায়ন। এ বিষয়ে হেফাজতের নেতাদের অভিযোগ, সরকার ২০১৭ সালে দাওরায়ে হাদিসের সনদকে স্নাতকোত্তরের সমমান দেওয়ার পরও কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষায় সেই স্বীকৃতির কার্যকর প্রয়োগ হচ্ছে না। এ কারণেই নতুন করে এ দাবি যুক্ত করা হয়েছে এবং সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে ধর্মীয় শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে সরকারি মাদ্রাসার ডিগ্রির পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস (স্নাতকোত্তর সমমান) ডিগ্রির কথা উল্লেখ করার দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনা, ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে কেন্দ্র করে সহিংসতা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিও নতুন ৯ দফায় রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাওরায়ে হাদিসকে আরবি সাহিত্য ও ইসলামি শিক্ষায় মাস্টার্সের সমমান দেওয়ার পর কওমি মাদ্রাসাগুলোর সর্বোচ্চ সংস্থা আল–হায়াতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি শুকরানা মাহফিলের আয়োজন করেছিল। তৎকালীন প্রয়াত আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই মাহফিলে শেখ হাসিনাকে ‘কওমী জননী’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল।
আগের দাবিগুলোর মধ্য থেকে এবার সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাটি পুনঃস্থাপনের দাবিটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে হেফাজত নেতা আজিজুল হক Islamabadী বলেন, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে এবং ইতিমধ্যে সংসদে এ সংক্রান্ত বিল পাস হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। তবে বাস্তবে এখনও সংবিধান সংশোধনের কোনো বিল সংসদে উত্থাপিত হয়নি, কেবল বিশেষ কমিটি কাজ শুরু করেছে।
একইভাবে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে দেওয়া ১২ দফা দাবির মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি ছিল। কিন্তু এবার সেই দাবিটিও বাদ পড়েছে। হেফাজত নেতাদের মতে, ইতিমধ্যে ট্রাইব্যুনাল একটি বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং হেফাজতের মামলাগুলো ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তরিত হওয়ায় এই দাবির আর প্রয়োজন নেই।
হেফাজতে ইসলাম মূলত ২০১১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা’র বিরোধিতার মাধ্যমে আলোচনায় আসে। এরপর ২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তারা ১৩ দফা দাবি নিয়ে রাজপথে নামে। ২০১৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে হেফাজতে ইসলাম একাধিক দফায় দাবি জানিয়েছে। ওই বছরের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের অবস্থান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় প্রভাব ফেলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংগঠনটি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ১২ দফা দাবি জানিয়েছিল, যা এখন বিএনপি সরকারের আমলে ৯ দফায় রূপ নিয়েছে।

