২০ বছর পরও কেন বিতর্কিত ‘কভি আলবিদা না কেহনা’?

২০০৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল করণ জোহর পরিচালিত বলিউডের বহুল আলোচিত সিনেমা ‘কভি আলবিদা না কেহনা’। মুক্তির পর দুই দশক পার হয়ে গেলেও সিনেমাটি নিয়ে দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে বিতর্ক আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। দুই বিবাহিত মানুষের পরকীয়া সম্পর্কের গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই সিনেমাটি তৎকালীন ভারতীয় সমাজের জন্য অত্যন্ত সাহসী এক পদক্ষেপ ছিল। শাহরুখ খান, রানি মুখার্জি, প্রীতি জিনতা ও অভিষেক বচ্চন অভিনীত এই ছবিটির গল্প দর্শকদের স্পষ্ট দুটি ভাগে বিভক্ত করেছিল। এক পক্ষ একে আধুনিক দাম্পত্য জীবনের এক পরিণত ও বাস্তবসম্মত চিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, অন্যদিকে অন্য পক্ষ মনে করেছিলেন যে সিনেমাটিতে পরকীয়াকে অতিরিক্ত সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে।

২০ বছর পর বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট থেকে যদি সিনেমাটিকে নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পেছনের কারণগুলো কি কোনোভাবে সঙ্গীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতাকে বৈধতা দিতে পারে? জাঁকজমকপূর্ণ উপস্থাপনা, বিলাসী জীবনযাত্রা, চমৎকার পোশাক, নিউইয়র্কের মনোরম লোকেশন এবং ‘মিতওয়া’ ও ‘তুমহি দেখো না’র মতো তুমুল জনপ্রিয় গানের সমন্বয়ে সিনেমাটি ছিল দারুণ দৃষ্টিনন্দন। তবে এই বাহ্যিক চাকচিক্যের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল দুটি ভেঙে পড়া দাম্পত্যের করুণ বাস্তবতার গল্প।

সিনেমায় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া হতাশ এক যুবকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শাহরুখ খান, যার চরিত্রের নাম ছিল দেব শরণ। দুর্ঘটনার পর তার ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ায় দেবের মনে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়। তবে তার বৈবাহিক জীবনের টানাপোড়েন কেবল এই দুর্ঘটনার পরই শুরু হয়নি। দেবের স্ত্রী রিয়া শরণ (প্রীতি জিনতা) ছিলেন পেশাগতভাবে অত্যন্ত সফল এবং স্বামীর চেয়ে বেশি উপার্জন করতেন। স্ত্রীর এই সাফল্য দেবের মধ্যে তীব্র হীনম্মন্যতা ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়। রিয়া তাদের সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও দেব নিজের ক্ষোভ থেকে অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এখানেই সিনেমার অন্যতম বড় প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়—দাম্পত্যে সমস্যা থাকলেই কি অন্য কোনো সম্পর্কে জড়ানোর অধিকার তৈরি হয়? দেবের একাকিত্ব ও কষ্ট দর্শককে বোঝানো হলেও, নিজের স্ত্রীর সঙ্গে সমস্যার সমাধান না করে পরকীয়া বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই ন্যায্য বলা যায় না।

অন‍্যদিকে, রানি মুখার্জি অভিনীত মায়ার দাম্পত্য জীবনও সুখের ছিল না। তার স্বামী ঋষির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিষেক বচ্চন। বিয়ের আগে থেকেই মায়ার মনে এই বিয়ে নিয়ে এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছিল। মায়া ও ঋষির ব্যক্তিত্বের মধ্যেও ছিল আকাশ-পাতাল তফাত। ঋষি তার দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর কাছ থেকে বেশি ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতার বহিঃপ্রকাশ আশা করতেন, যা মায়ার কাছে প্রায়ই এক ধরনের মানসিক চাপ বলে মনে হতো। ঋষি নিজেও যে একজন নিখুঁত স্বামী ছিলেন তা নয়, তার আচরণে অনেক সময় অপরিণত ও সংবেদনশীলতার অভাব প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু সঙ্গীর এই দুর্বলতাগুলোকে কি পরকীয়ার কারণ হিসেবে দাঁড় করানো যায়? মায়া যদি ঋষিকে স্বামীর চেয়ে বেশি বন্ধু মনে করতেন, তবে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি কথা বলার সুযোগ তার কাছে ছিল।

দেব ও মায়ার সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তাদের এই সম্পর্কটি শুরুতে শারীরিক ছিল না, বরং তা গড়ে উঠেছিল মানসিক বোঝাপড়ার ওপর ভিত্তি করে। নিজেদের দাম্পত্যের হতাশা ও একাকিত্ব ভাগ করে নিতে নিতেই তারা একে অপরের কাছে চলে আসেন। তবে এই মানসিক পরকীয়াও একদিনে হুট করে গড়ে ওঠেনি। ধীরে ধীরে একে অপরকে সময় দেওয়া, ব্যক্তিগত অনুভূতি ভাগ করা, নিজের জীবনসঙ্গীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা এবং নতুন মানুষের প্রতি দুর্বলতা তৈরি হওয়া—সবই ছিল একের পর এক নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের ফল। দেব ও মায়ার সামনে সত্য প্রকাশ করার একাধিক সুযোগ ছিল, কিন্তু তারা তা না করে মিথ্যা ও গোপনীয়তার পথ বেছে নেন এবং শেষ পর্যন্ত শারীরিক সম্পর্কে জড়ান।

সমালোচকদের প্রধান আপত্তির জায়গাটি এখানেই। সিনেমাটি পরকীয়াকে শুধু পর্দায় দেখায়নি, বরং করণ জোহরের চিরচেনা জাঁকজমকপূর্ণ উপস্থাপনা, নান্দনিক সিনেমাটোগ্রাফি এবং চমৎকার সব রোমান্টিক গানের মাধ্যমে দেব-মায়ার সম্পর্ককে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এর ফলে দর্শকেরা তাদের সম্পর্কের আবেগীয় দিকটির সঙ্গে সহজেই যুক্ত হতে পারলেও, এই প্রতারণার কারণে রিয়া ও ঋষি যে চরম মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে গেছেন, তা গল্পের সৌন্দর্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। অবশ্য অনেকে মনে করেন, করণ জোহর পরকীয়াকে সমর্থন করেননি, বরং তিনি কেবল ভালোবাসাহীন এক দাম্পত্যে আটকে থাকা মানুষের দীর্ঘশ্বাসকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ‘কভি আলবিদা না কেহনা’র সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—সম্পর্কে অসুখী হলে সঙ্গীর প্রতি সৎ থাকা জরুরি। আজ দুই দশক পরও সিনেমাটি দর্শককে এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় যে, ভালোবাসা ফুরিয়ে গেলে সম্পর্ক শেষ করার সাহস দেখানো ভালো, নাকি প্রতারণার পথ বেছে নেওয়া সহজ?