মাতৃত্বের কষ্ট ও ত্যাগ: ইসলামে মায়ের অতুলনীয় মর্যাদা ও সওয়াব

মাতৃত্ব কেবল একটি নতুন জীবনের জন্ম দেওয়া নয়, বরং এটি একজন নারীর শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক রূপান্তরের এক অসাধারণ পথচলা। এই দীর্ঘ যাত্রায় একজন মাকে নানাবিধ শারীরিক ক্লান্তি, প্রসবোত্তর মানসিক চাপ ও রাত জেগে সন্তানের সেবা করার মতো কঠিন পরিস্থিতি পাড়ি দিতে হয়। মায়েদের এই সীমাহীন কষ্ট ও ত্যাগকে ইসলাম কেবল স্বীকৃতিই দেয়নি, বরং একে পরিণত করেছে অত্যন্ত পবিত্র এক ইবাদতে।

পবিত্র কোরআনে মায়েদের এই ত্যাগের কথা বারবার গুরুত্বের সাথে স্মরণ করানো হয়েছে। সুরা আহকাফের ১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, মানুষ যেন তার পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করে। সেখানে বলা হয়েছে, মা তার সন্তানকে কষ্টের সাথে গর্ভে ধারণ করেছেন এবং কষ্টের সাথেই তাকে প্রসব করেছেন। একইভাবে সুরা লুকমানের ১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মা তার সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছেন। তাই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায়ের পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রতিও কৃতজ্ঞ হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মায়ের প্রতি সদাচরণকে ইসলামের অন্যতম সর্বোচ্চ গুরুত্ববহ বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। সহিহ বুখারির (হাদিস নম্বর: ৫৯৭১) একটি বর্ণনায় দেখা যায়, এক ব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তার কাছে সবচেয়ে বেশি উত্তম ব্যবহারের অধিকারী কে? নবীজি (সা.) পরপর তিনবার উত্তর দেন, 'তোমার মা'। চতুর্থবার জিজ্ঞেস করার পর তিনি বলেন, 'তারপর তোমার বাবা'।

এছাড়া সুনানে নাসায়ির (হাদিস নম্বর: ৩১০৪) একটি বিখ্যাত হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, 'জান্নাত মায়ের পায়ের নিচে।' সুনানে ইবনে মাজাহ-র (হাদিস নম্বর: ২৭৮১) আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, সাহাবি মুআবিয়া ইবনে জাহিমা (রা.) যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জিহাদে যাওয়ার পরামর্শ চান, তখন নবীজি তাকে জিজ্ঞেস করেন, তার মা জীবিত আছেন কি না। তিনি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে নবীজি (সা.) তাকে মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেন, জান্নাত মায়ের পায়ের নিচেই রয়েছে।

প্রসবকালীন কষ্টের চূড়ান্ত ত্যাগের জন্যও ইসলামে রয়েছে বিশেষ প্রতিদান। মুসনাদে আহমদের (হাদিস নম্বর: ২৩৮৬৫) একটি হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহর পথে নিহত হওয়া বা মহামারিতে মৃত্যুর মতো প্রসবকালে কোনো গর্ভবতী নারী মারা গেলেও তাকে শাহাদাতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

সপ্তম শতাব্দীর তৎকালীন আরব সমাজে যখন নারীদের চরম অবমাননা করা হতো, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বৈপ্লবিক শিক্ষা মায়েদের সম্মানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। আধুনিক যুগের ব্যস্ত জীবনে অনেকেই পিতা-মাতার সাথে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে পারেন না, যার ফলে বয়স্ক মায়েরা একাকীত্বে ভোগেন। নবীজির এই চিরন্তন শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মাতৃত্ব কেবল একটি পারিবারিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পবিত্র এক ইবাদত। তাই ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে মায়েদের শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদার প্রতি আমাদের সর্বদা সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন।