দীর্ঘ সময় ধরে চলা অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীরা অবশেষে তাদের প্রাপ্য অবসর ও কল্যাণসুবিধার অর্থ পেতে শুরু করেছেন। গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই অর্থ প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। একই দিন আবেদনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের অনুকূলে অর্থ ছাড় করা হয়েছে এবং মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে তাদের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অনুকূলে অবসরসুবিধার একাংশের টাকা ছাড় করা হয়েছে বা হচ্ছে। এ জন্য প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত যাঁরা আবেদন করেছেন, তাঁদের অনুকূলে এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে কল্যাণসুবিধার ক্ষেত্রেও ৫৩ হাজার ৪৭৭টি আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৬৪৭ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, 'আইবাস প্লাস প্লাস' সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে এই অর্থ পাঠানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই করা হয়, ফলে আবেদনে সামান্য ভুল থাকলেই অর্থ পাঠানো সম্ভব হয় না। চার হাজারের বেশি আবেদনকারীর আবেদন অসম্পূর্ণ থাকায় বা তথ্যে ভুল থাকায় তাদের অর্থ ছাড় আপাতত আটকে আছে। ভুল সংশোধনের পর পর্যায়ক্রমে তাদের অর্থও প্রদান করা হবে।
বর্তমানে অবসরসুবিধা বোর্ডের তহবিলে ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা রয়েছে এবং আবেদনকারীদের পুরো পাওনা পরিশোধ করতে প্রায় ৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা প্রয়োজন। ফলে আপাতত যে অর্থ দেওয়া হচ্ছে, তা তাদের পুরো প্রাপ্য নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবেদনকারীদের পুরো প্রাপ্য অর্থ দ্রুত পরিশোধ করতে হলে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। কল্যাণসুবিধার ক্ষেত্রেও আবেদনকারীদের পুরো অর্থ পরিশোধ করতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। সরকার এরই মধ্যে অবসরসুবিধা বোর্ডের জন্য ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ২০০ কোটি টাকার বন্ড দিয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরও ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার বন্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব বন্ড থেকে মুনাফা পাওয়া যায় ছয় মাস পরপর, তাই তাৎক্ষণিকভাবে পুরো অর্থ পরিশোধের জন্য বন্ডের পাশাপাশি নগদ বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষকদের অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পর থেকে অবসরসুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা বাড়তে থাকে এবং এ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। অনেক শিক্ষক-কর্মচারীকে প্রাপ্য টাকা পেতে ঘুষ দিতে হতো। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বড় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের এই সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করছেন।
সারা দেশে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। চাকরিকালে শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ অবসরসুবিধার জন্য এবং ৪ শতাংশ কল্যাণসুবিধার জন্য চাঁদা হিসেবে কেটে রাখা হয়। ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই হারে চাঁদা নেওয়া হয়েছে; এর আগে অবসরসুবিধার জন্য ৪ শতাংশ এবং কল্যাণসুবিধার জন্য ২ শতাংশ হারে চাঁদা নেওয়া হতো। এছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়, যার মধ্যে ৭০ টাকা অবসরসুবিধা এবং ৩০ টাকা কল্যাণসুবিধা তহবিলে জমা হয়। বাকি অর্থ সরকার এবং তহবিলে জমা থাকা অর্থের সুদ থেকে সমন্বয় করা হয়। কল্যাণসুবিধার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক-কর্মচারী সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত পেয়েছেন বা পাচ্ছেন। অবসরসুবিধার জন্য সর্বোচ্চ সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়।
অবসরসুবিধা বোর্ডের সচিব মো. মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের ভোগান্তি কমাতে সরকার একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীকে সুবিধার একাংশ দিয়েছে। বর্তমানে অবসরসুবিধা বোর্ডের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা চাঁদা জমা হয়, অথচ প্রাপ্য পুরো অর্থ পরিশোধ করতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২১০ কোটি টাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রতি মাসেই বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যায়।

