রাজধানীর ওপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে একটি পরিকল্পিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ উপনগরী গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিন দশকেরও বেশি সময় আগে শুরু হয়েছিল পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প। নিজেদের জীবনের সব সঞ্চয় বিনিয়োগ করে হাজার হাজার মানুষ এখানে প্লট কিনলেও, আজও সেখানে কাঙ্ক্ষিত নাগরিক জীবন গড়ে ওঠেনি। যে বিশাল এলাকায় এতদিনে মুখর জনবসতি থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন পর্যন্ত মাত্র অল্প কিছু বাড়ি নির্মিত হয়েছে। বাকি জমিগুলোতে এখনো চলছে চাষাবাদ, আর রাতের অন্ধকারে সড়কবাতির অভাবে পুরো এলাকা হয়ে পড়ে নির্জন ও অন্ধকার। সম্প্রতি প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তন করে পূর্বাচলকে ঢাকা জেলা ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় আনা হয়েছে। এই পরিবর্তনকে অনেকে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার মনে করলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু কাগজে-কলমে সীমানা বদলালেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধান হবে না।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে এই মেগা প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। মোট ৬ হাজার ১৫০ একর জমিতে ৩০টি সেক্টরে ভাগ করে প্রায় ২৬ হাজার আবাসিক প্লট এবং লক্ষাধিক অ্যাপার্টমেন্টের পরিকল্পনা করা হয়েছিল এতে। প্রকল্পটিতে এ পর্যন্ত ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। তবে ২০১৩ সালের নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও আজও এই শহর পূর্ণতা পায়নি। ভূমি উন্নয়ন ও কিছু সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও গ্যাস সংযোগ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নিয়মিত বাজার ও পর্যাপ্ত যানবাহনের মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধার অভাব এখানে প্রকট। ফলে রাজউক ২১ হাজারের বেশি প্লট হস্তান্তর করলেও এখন পর্যন্ত মাত্র তিন শতাধিক প্লটে বাড়ি নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।
প্লট বরাদ্দ পাওয়া মালিকদের অভিজ্ঞতাও চরম হতাশার। ২০০৯ সালে প্লট পাওয়া জহিরুল ইসলাম জানান, রাজউকের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্কুল-কলেজ, সড়কবাতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপেক্ষায় তিনি বছরের পর বছর পার করেছেন। শেষ পর্যন্ত প্ল্যান পাসের তিন বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়ে বাধ্য হয়েই কোনো নাগরিক সুবিধা ছাড়াই তিনি বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু করেছেন। একই অবস্থা শাহজাহান মিয়ারও, যিনি ২০১৪ সালে প্লট বরাদ্দ পেয়েও এখনো জায়গাটি ফাঁকা ফেলে রেখেছেন। পানি ও বিদ্যুতের কিছুটা সুবিধা থাকলেও সড়কবাতি ও নিরাপত্তার অভাবে তিনি বাড়ি বানানোর সাহস পাচ্ছেন না। প্লট মালিকদের অভিযোগ, গ্যাস, বাজার ও নিয়মিত যানবাহনের অভাবে এলাকাটি বসবাসের অনুপযোগী। এছাড়া সীমানা প্রাচীর না থাকায় অনেক প্লটে স্থানীয় বাসিন্দারা চাষাবাদ করছেন। তিন জেলার সীমানা বিরোধ এবং রাজউকের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রতিদিন ফাইল আটকে থাকার কারণেও চরম হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে তাদের।
এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা নিরসনে সম্প্রতি সরকার একটি বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে পূর্বাচলকে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার অংশ থেকে বাদ দিয়ে ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এটি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও ঢাকা ওয়াসার আওতাধীন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে রাজউকের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। দ্রুতই সেখানে প্রশাসনিক ভবন ও জোনাল অফিস স্থাপন করা হবে। মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হলে প্লট মালিকরা বাড়ি নির্মাণে আগ্রহী হবেন এবং প্রয়োজনে সময়সীমা বৃদ্ধির আবেদন করতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম জানিয়েছেন, পূর্বাচলকে দ্রুত বাসযোগ্য করে তুলতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু অবকাঠামো উন্নয়নই নয়, প্লট মালিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করে তাদের সমস্যা শোনা হচ্ছে এবং ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সড়ক সম্প্রসারণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, মার্কেট, খেলার মাঠ ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রায় ৮ হাজার ৮৭০ কোটি টাকার একটি নতুন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে এখানে চারটি থানা, ছয়টি তদন্ত কেন্দ্র এবং হাজার হাজার নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাবসহ পুলিশের বড় অবকাঠামো গড়ার পরিকল্পনা চলছে।
তবে এই প্রশাসনিক পরিবর্তনের সমালোচনা করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি মনে করেন, পূর্বাচলকে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করে ঢাকাকে আরও বড় করা সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতির পরিপন্থী। এর ফলে ঢাকামুখিতা না কমে বরং আরও বাড়বে। তার মতে, পূর্বাচলকে যদি আলাদা সিটি কর্পোরেশন হিসেবে অথবা নারায়ণগঞ্জের অধীনে রাখা হতো, তবে একটি ভিন্ন নগর কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারত। কাগজে-কলমে সীমানা বদলালেও মাঠপর্যায়ে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ও সেবা নিশ্চিত করতে না পারলে এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হতে পারে। ঢাকার আবাসন সংকট সমাধানের আদর্শ যে প্রকল্পকে ভাবা হয়েছিল, তা এখন নিজেই সংকটের প্রতীক। এই বিশাল এলাকাকে আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখনই সমন্বিত, স্বচ্ছ ও দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, অন্যথায় মধ্যবিত্তের স্বপ্নের এই শহর আরও বহু বছর বন্দি হয়ে থাকবে।

