প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ছিলেন একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ও দেশপ্রেমিক, যিনি আমৃত্যু সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে গেছেন। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কার ও মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবর্তক হিসেবে তাকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান রূপকার বলা হয়। তিনি দাতাদের সাহায্য-নির্ভরতা থেকে অর্থনীতিকে বের করে আনার পথ দেখিয়েছিলেন এবং বিদেশি সাহায্য ছাড়াও যে দেশ উন্নতি করতে পারে, সেই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি ভ্যাট আইন চালু করেন। তার রাজনৈতিক জীবনে ১২ বার জাতীয় বাজেট পেশ করে তিনি উপমহাদেশ তথা বিশ্বে এক রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন।
১৯৩২ সালে মৌলভীবাজারের বাহারমর্দন গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সাইফুর রহমান। তার পিতা আব্দুল বাছির ও মা তালেবুননেসা। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তিনি মৌলভীবাজার সরকারি হাইস্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫১ সালে মুরারীচাঁদ কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকম ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ১৯৫০ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত লন্ডনে পড়াশোনা করেন এবং দি ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালে পেশাজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান জাতীয় বেতন কমিশনে প্রাইভেট সেক্টর থেকে একমাত্র সদস্য মনোনীত হন। পরবর্তীতে ১৯৭৩ ও ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় বেতন কমিশনেরও সদস্য ছিলেন।
১৯৭৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তিনি অর্থ, বাণিজ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক বিষয়গুলো ছিল তার নখদর্পণে। তার সময়কালেই তৈরি পোশাক খাতে ব্যাংক-টু-ব্যাংক ঋণপত্র ও বন্ডেড ওয়ারহাউজ সুবিধা চালুসহ অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের বিকাশ ঘটে। ১৯৯৪ সালে মাদ্রিদে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সুবর্ণ জয়ন্তী সম্মেলনে তিনি গভর্নর নির্বাচিত হন। এছাড়া ১৯৮০-৮২ মেয়াদে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি ও আইএফএডিতে বাংলাদেশের গভর্নর এবং ১৯৯৪-৯৫ সালে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় বাণিজ্যমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত টেকনোক্রেট মন্ত্রী এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন তিনি। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিভিন্ন আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, বেকার সমস্যা দূরীকরণ এবং মানবসম্পদ দক্ষ করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন সাইফুর রহমান। তার প্রবর্তিত কর ব্যবস্থার সংস্কার, শিল্প ব্যবস্থায় প্রাইভেটাইজেশন ও উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করে। তিনি কৃষি ও কৃষকদের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে গণ্য হতেন এবং প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগে অনুপ্রাণিত করতেন। ২০০৯ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার কর্ম ও আদর্শের মাধ্যমে তিনি আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার তার ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।
তিনি ১৯৭৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সরকারের অর্থ, বাণিজ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি ভাটা, তৈরি পোশাক খাতে ব্যাংক-টু-ব্যাংক ঋণপত্র ও বন্ডেড ওয়ারহাউজ সুবিধা চালুসহ অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের বিকাশ ও নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি দেশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কারে পেইনফুল সিদ্ধান্তগুলো সাইফুর রহমানই নিয়েছেন। দেশের অর্থনীতিতে তিনি সবচেয়ে বেশি সংস্কার করেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তার অন্যতম রূপকার তিনি। ১৯৯৪ সালে স্পেনের মাদ্রিদে বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সুবর্ণ জয়ন্তী সম্মেলনের গভর্নর নির্বাচিত হন। ১৯৮০-১৯৮২ মেয়াদে তিনি বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি, আইএফএডিতেও বাংলাদেশের গভর্নর ছিলেন। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানও ছিলেন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথমে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী ও পরে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

