হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেন সোনা চোরাচালানের এক নিরাপদ করিডরে পরিণত হয়েছে। একের পর এক অভিযান ও আইনশৃঙ্খলার কড়াকড়ি সত্ত্বেও থামছে না এই অবৈধ বাণিজ্য। ফলের ক্যারেট, বিমানের টয়লেট কিংবা যাত্রীর শরীর—চোরাকারবারিরা কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। গত পাঁচ বছরেই এই বিমানবন্দর থেকে প্রায় দুই হাজার কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে। আগে দু-এক কেজির চালান ধরা পড়লেও বর্তমানে একেকটি চালানে ১৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত সোনা পাওয়া যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে বাহকরা ধরা পড়লেও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মূল হোতারা বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিমানবন্দরের ভেতরের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় চালান বারবার আসা অসম্ভব। তিনি মনে করেন, শুধু বাহককে আটক করে এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়; বরং পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কার্গো, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা ও কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বিত নজরদারি, আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মকর্তাদের নিয়মিত রোটেশন নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এসএম রাগিব সামাদ দাবি করেন, নজরদারি জোরদার থাকার কারণেই স্বর্ণের চালানগুলো ধরা পড়ছে এবং তারা বিমানবন্দরকে চোরাকারবারিমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিমানবন্দর থানার তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে (২০২১ থেকে ২০২৬ সাল) সোনা চোরাচালানের অভিযোগে মোট ৫৪১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি ও ২০২৫-২৬ সালে ৯২টি। ঢাকা কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত শতাধিক অভিযানে প্রায় ২ হাজার কেজি সোনা জব্দ করা হয়। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বৈধভাবে আমদানি করা সোনার বার ও অলংকার থেকে ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬৯৭ কেজি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৪ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১৭ কেজি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৮ কেজি ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭০ কেজির কিছু বেশি সোনা জব্দ হয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী অন্তত এক ডজন বাংলাদেশি এই চোরাচালান চক্র নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের সহযোগিতায় সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস, নিরাপত্তা ইউনিট এবং পুলিশ ও আনসারের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামও এসেছে।
চোরাচালানের নতুন কৌশল হিসেবে বর্তমানে দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের ফ্লাইট ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে দুবাই থেকে আসা যাত্রী আকাশপথেই অন্য সদস্যের কাছে সোনা হস্তান্তর করেন, যাতে অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল ব্যবহার করে সহজেই বিমানবন্দর ত্যাগ করা যায়। এছাড়া অতীতে কেবিন ক্রু, পাইলট, প্রকৌশলী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও পাওয়া গেছে। চলতি বছরেই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সোনার তিনটি বড় চালান জব্দ করা হয়েছে। ২৮ মার্চ রাতে দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেটের প্যানেলের ভেতর সাদা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় ১৫৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। মোট ওজন ছিল ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম। ২৪ ক্যারেটের এসব সোনার বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। ঘটনার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কয়েকজনের মোবাইল ফোনে চোরাকারবারিদের ব্যবহৃত সাংকেতিক চিহ্ন বা কোডের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অধিকতর তদন্তের স্বার্থে এখনো কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শিগগিরই পুরো চক্রের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, তদন্তে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এরপর ২ জুলাই একই ধরনের আরেকটি চালান জব্দ হয়। দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে উদ্ধার করা হয় ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম সোনা, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এ ঘটনায় মামলা হলেও কোনোর ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। এরপর ১৯ জুলাই কার্গো ভিলেজে ফলের চালানের আড়ালে পাচারের নতুন কৌশল ধরা পড়ে। ক্যাথে প্যাসিফিক কার্গো ফ্লাইটে হংকং হয়ে আসা রামবুটান, চেরি ও অ্যাভোকাডোভর্তি একটি ক্যারেট থেকে ১৬ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়।

