সাইবার আইনে নতুন অপরাধ গুজব ও অপতথ্য, সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছর জেল

সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোকে নতুন অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে সরকার। এতে এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে। বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইনে এ ধরনের কোনো ধারা বা শাস্তির ব্যবস্থা নেই। একই সঙ্গে মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা ও বুলিংয়ের উদ্দেশ্যে ডিজিটাল তথ্য-уপাত্ত তৈরি ও প্রচারের অপরাধে শাস্তির পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে সংশোধনীতে।

প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’র স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে এমন যেকোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে গুজব বলা হবে। অন্যদিকে, ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি ও প্রচার করা মিথ্যা বা বিকৃত তথ্যকে অপতথ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

খসড়া আইনে সাধারণ অপরাধের শাস্তিও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে এসব অপরাধের সাজা সর্বোচ্চ দুই বছর জেল বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা হলেও সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী যদি কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু হন, তবে এই শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া অডিও কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত তথ্যকেও এই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

নতুন এই সংশোধনীতে আদালতের ক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে। কোনো কোম্পানি সাইবার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত তার লাইসেন্স, নিবন্ধন বা কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত, বাতিল কিংবা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে পারবে। এই ‘কোম্পানি’ শব্দের আওতা আরও বিস্তৃত করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অংশীদারি কারবার, সমিতি, সংঘ, সংগঠন, ট্রাস্ট এবং সংবিধিবদ্ধ সংস্থাসহ সব ধরনের আইনগত ব্যক্তিসত্তাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সব অপরাধের বিচার এখন আর সাইবার ট্রাইব্যুনালে হবে না। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার সন্ত্রাস, হ্যাকিং, রিভেঞ্জ পর্ন, ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, শিশু যৌন নিপীড়ন, সেক্সটর্শন এবং সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর মতো গুরুতর অপরাধগুলোর বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে। অন্যান্য সাধারণ অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হবে, যা প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর আওতায় মোবাইল কোর্টেও বিচার করা যাবে। এছাড়া অপতথ্য বা মানহানিকর কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্লক করা কনটেন্টের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এই খসড়াটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া শুরু করেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি প্রাথমিক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গত ২৯ জুন এই আইন সংশোধনে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সদস্য হিসেবে রয়েছেন।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশিদ ভূঞা জানিয়েছেন, এটি একটি প্রাথমিক বৈঠক ছিল এবং সব পক্ষের মতামত নিয়েই আইনটি চূড়ান্ত করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাইবার স্পেস ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের নাগরিক অধিকারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে একই সঙ্গে যারা সাইবার স্পেস ব্যবহার করে মানুষের চরিত্রহনন ও সাইবার বুলিংয়ের মতো অপরাধে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন রয়েছে।