নবম পে-স্কেল অনুমোদন: সরকারি বেতন কাঠামো ও সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘ এগারো বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। ২০১৫ সালের পর থেকে ঝুলে থাকা এই বেতন কাঠামো নিয়ে নানা মহলে জল্পনা-কল্পনা ছিল। তবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই প্রতীক্ষিত পে-স্কেলের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়, যা দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি যুগান্তকারী অথচ অত্যন্ত স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামোতে সরকারি কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখেই মূল বেতনে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চমকটি রয়েছে একেবারে নিচের স্তরে। ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাফে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি। অন্যদিকে সর্বোচ্চ বা ১ম গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। গ্রেড-১ থেকে ১১ পর্যন্ত বেতন বাড়ানো হয়েছে একশো শতাংশ পর্যন্ত। তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, এই পে-স্কেলের মাধ্যমে সরকার মূলত বৈষম্য কমানোরই চেষ্টা করেছে। অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের প্রায় এক যুগ পর নবম বেতন কমিশনের এই সুপারিশমালা নিঃসন্দেহে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জন্য এক বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি লুকিয়ে আছে এর অর্থায়নে। সরকারি হিসাব মতেই, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সামরিক ও অসামরিক মিলিয়ে প্রায় ২৪ লাখ নিয়মিত কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী উপকৃত হবেন। সব মিলিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের চিত্র খুব একটা সন্তোষজনক নয়, সেখানে এত বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দেওয়া সরকারের জন্য আক্ষরিক অর্থেই একটি দুঃসাধ্য কাজ। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যদিও জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় ধাপে ধাপে এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং চলতি অর্থবছরের বাজেটে এর জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দও রাখা হয়েছে, তারপরও বাকি অর্থের সংস্থান নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অত্যন্ত খোলামেলাভাবেই স্বীকার করেছেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণও নেবে। অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়লে ঋণ নেওয়াকে নেতিবাচকভাবে দেখার কিছু নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। কিন্তু অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, এক বছরের মধ্যে এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারকে ব্যাংক থেকে অধিক হারে ঋণ নিতে হতে পারে অথবা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) কাটছাঁট করতে হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেছেন, সাধারণত এডিপি বরাদ্দের ৮০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়, ফলে অব্যবহৃত প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো বাড়তি অংশ সরকার এই খাতে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু উন্নয়ন বাজেট কেটে অনুন্নয়ন বা পরিচালন ব্যয়ে অর্থ স্থানান্তর দীর্ঘমেয়াদে দেশের অবকাঠামোগত ও কাঠামোগত উন্নয়নের চাকাকে মন্থর করে দেয়, যা কোনোভাবেই একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।

নতুন এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার যে যথেষ্ট সতর্ক, তার প্রমাণ মেলে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায়। মূল্যস্ফীতি, বাজেটের ওপর আকস্মিক চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার চাপ সামাল দিতে সরকার অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে এই পে-স্কেল একযোগে কার্যকর না করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে প্রদান করা হবে এবং আনুষঙ্গিক ভাতাসমূহ ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, একসঙ্গে সব অর্থ বাজারে ছাড়লে যে চাপ তৈরি হবে, তা এড়াতেই আগামী দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে।

তবে এই সমস্ত আশাবাদের মধ্যেও সবচেয়ে বড় জুজুর নাম হলো মূল্যস্ফীতি। আমাদের দেশের চিরায়ত বাজার ব্যবস্থা এতটাই অস্থিতিশীল ও সিন্ডিকেটনির্ভর যে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ার সামান্যতম গুঞ্জন শুনলেই বাজারে নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া এবং যাতায়াত ব্যয় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে দেশ এমনিতেই ৮ থেকে ৮.৫ শতাংশের মতো একটি উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে পয়েন্ট আউট করেছেন, বাজারে পণ্য সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফায়দা লোটার চেষ্টা হতে পারে। তাঁর মতে, অর্থায়নের জন্য ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে তা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাপ ফেলবে এবং পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে। তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও স্বীকার করেছেন, বেতন বৃদ্ধির কারণে কিছুটা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থেকেই যায়। এই ঝুঁকি মোকাবেলা করার জন্য সরকারকে এখন থেকেই বাজার তদারকিতে কঠোর হতে হবে।

নতুন পে-স্কেলের একটি অত্যন্ত মানবিক এবং প্রশংসনীয় দিক হলো অবসরপ্রাপ্ত বা পেনশনভোগীদের জন্য নেওয়া যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। নবম জাতীয় পে-স্কেলে পেনশনভোগীদের স্বস্তি দিতে নিট পেনশনের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই বৃদ্ধি ঢালাওভাবে সবাইকে সমান হারে দেওয়া হচ্ছে না, বরং একটি প্রগতিশীল বা স্তরীভূত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। যারা ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশন পান, তাদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ। এরপর ৯,০০১ থেকে ২০ হাজার টাকার ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ, ২০,০০১ থেকে ৩০ হাজার টাকার ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ, ৩০,০০১ থেকে ৪০ হাজার টাকার ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার ওপরের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ হারে পেনশন বৃদ্ধি পাবে।

সবশেষে যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ থেকে যায়, তা হলো দেশের বৃহত্তর বেসরকারি খাত। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে যে মূল্যস্ফীতির ঢেউ উঠবে, তার সরাসরি শিকার হবেন এই বেসরকারি খাতের কর্মীরা। অর্থনীতিবিদ সায়মা হক বিদিশা যথাযথভাবেই বলেছেন, পে-স্কেলের কারণে বেসরকারি খাতে প্রচণ্ড চাপ ও হতাশা তৈরি হবে। একদিকে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে ব্যবসায়ের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে কর্মীদের বেতন বাড়ানো সম্ভব হবে না। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে সরকারকে অবশ্যই বেসরকারি খাতের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। ড. বিদিশা পরামর্শ দিয়েছেন, বেসরকারি খাতকে ইনসেনটিভ বা প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করে তাদের উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার যদি ব্যবসা সহজীকরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে পারে, তবে বেসরকারি খাত এই ধাক্কা সামলিয়ে উঠতে পারবে। অন্যথায়, সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে জীবনমানের যে বিশাল ফারাক তৈরি হবে, তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।

এই বৈষম্যহীন বিন্যাসের ফলে সমাজের প্রবীণ ও বয়স্ক নাগরিকরা, যারা তাদের জীবনের সেরা সময়টা রাষ্ট্রের সেবায় ব্যয় করেছেন, তারা তাদের শেষ বয়সে এসে চিকিৎসা ও জীবনযাপনের ক্রমবর্ধমান ব্যয় কিছুটা হলেও সামাল দিতে পারবেন। এটি একটি নিরেট কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য, যার সাধুবাদ সরকার পেতেই পারে। সবশেষে যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ থেকে যায়, তা হলো দেশের বৃহত্তর বেসরকারি খাত। দেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ এবং পেনশনভোগী রয়েছেন আরো ৯ লাখের মতো, অর্থাৎ মোট সুবিধাভোগীর সংখ্যা ২৩-২৪ লাখ। কিন্তু এর বাইরে দেশের কোটি কোটি মানুষ বেসরকারি খাত, কৃষি বা স্বকর্মসংস্থানে নিয়োজিত।