বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন প্রথম আলোর কূটনৈতিক প্রতিবেদক রাহীদ এজাজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। ২০২৪–এর গণ–অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি তিনি কখনো ভাবেননি। তবে অধ্যাপক ইউনূস দায়িত্বে থাকবেন নিশ্চিত হওয়ার পরই তিনি রাজি হয়েছিলেন। দেড় বছরের এই অভিজ্ঞতাকে তিনি সুখকর না বললেও একটি ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি কোনো তদবিরের মাধ্যমে এই পদে যাননি, তাই সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে তিনি বিচলিত নন।
তৌহিদ হোসেন জানান, সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা। ড. ইউনূস ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর কর্মপদ্ধতি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন, কারণ ভারত একটি বাস্তবতা। শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার পর ভারতের কাছ থেকে উষ্ণ সাড়া পাওয়া যায়নি, এমনকি চীন বা অন্যান্য দেশের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর বার্তাও দেরি করে এসেছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ড. ইউনূসের প্রথম ফোনালাপের উদ্যোগও তাঁদেরই নিতে হয়েছিল।
উপদেষ্টা হিসেবে প্রথম তিন–চার মাস তিনি অনেকটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছিলেন এবং রাষ্ট্রদূত নিয়োগের মতো বিষয়ে ড. ইউনূসের পূর্ণ সম্মতি ছিল। ২০২৪–এর ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি কোথাও বাধাগ্রস্ত হননি। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ২০২৪–এর নভেম্বর–ডিসেম্বরের দিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে তিনি কিছুটা টানাপোড়েনের সম্মুখীন হন। তিনি জানান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণ ছাড়া দিল্লি যাওয়া ঠিক হবে না বলে তিনি ড. ইউনূসকে জানিয়েছিলেন, যা তিনি মেনেও নিয়েছিলেন।
তৌহিদ হোসেন জানান, লুৎফে সিদ্দিকীকে আন্তর্জাতিক বিষয়–সংক্রান্ত বিশেষ দূত নিয়োগের বিষয়টি তিনি সরকারি নির্দেশ জারির পর জানতে পেরেছিলেন, যা তাঁর জন্য ছিল একটি ধাক্কা। তিনি জানান, তিনি তিন দফা পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল একটি তথাকথিত ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর সক্রিয়তা। জেনেভার বিমানবন্দরে আসিফ নজরুলকে নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর একটি মধ্যাহ্নভোজে তাঁকে ডেকে অভিযুক্তের মতো সমালোচনা করা হলে তিনি পদত্যাগের কথা জানান।
২০২৫–এর ২২ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের কয়েকজনকে নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। তখন তিনি মির্জা ফখরুলসহ অন্যদের কাছে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এছাড়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটিও তাঁকে না জানিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যা তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি ড. ইউনূসকে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তিনি কেবল ইউনূসের ওপর আস্থা রেখেই দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তিনি সরে যেতে চান।
তৌহিদ হোসেন আরও উল্লেখ করেন যে, সরকারের শেষ ছয় মাসে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থবির হয়ে পড়েছিল এবং নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পূরক বাণিজ্যচুক্তিটি আরও তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। শেষ পর্যায়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনেক দায়িত্ব জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার কাছে চলে গিয়েছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের বোঝাপড়ায় ঘাটতি ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

